ঠাকুরগাঁওয়ে স্কুলছাত্রী ধর্ষণ: ৩ জনের আমৃত্যু, ৩ জনের যাবজ্জীবন
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
১৯ জুলাই, ২০২৬
ঠাকুরগাঁওয়ে এক স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দীর্ঘ ১৫ বছর পর চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে দণ্ডিতদের সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে ঠাকুরগাঁও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আলী মনসুর এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের গোয়ালপাড়া এলাকার ইউনুস কসাইয়ের ছেলে আনিস রানা, মুসলিমনগর এলাকার মাইরুদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম এবং ভোট কসাইয়ের ছেলে মো. দুলাল। আদালত তাদের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন।
অন্যদিকে, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—পৌর শহরের মুসলিমনগর এলাকার মো. সেলিমের ছেলে আনিছুর, বাংরু মোহাম্মদের ছেলে মো. খতিবুর খতু এবং বজলুর ছেলে মো. লালু। তাদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী দক্ষিণ সালন্দর এলাকায় বান্ধবীর বাড়ি থেকে ফিরছিল। পথে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় সড়কের পাশে এনামুল পেট্রোল পাম্পের পেছনের একটি নির্জন এলাকায় কয়েকজন যুবক তার পথরোধ করে। পরে তাকে জোরপূর্বক একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনজন পর্যায়ক্রমে তাকে ধর্ষণ করেন এবং অপর তিনজন এই জঘন্য অপরাধে সহযোগিতা করেন।
ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে স্থানীয় এক ব্যক্তি এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান। পরে ভুক্তভোগী বাড়িতে ফিরে পরিবারকে বিষয়টি জানালে তাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর ভুক্তভোগীর বাবা মো. মোসলেম উদ্দিন বাদী হয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
রায়ে আদালত স্পষ্ট উল্লেখ করেন, আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(এ) ধারার সুবিধা পাবেন না। অর্থাৎ, জেল কোড অনুযায়ী তারা কোনো ধরনের সাজা মওকুফ বা রেমিশনের (কারাদণ্ড হ্রাস) সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না।
তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির ক্ষেত্রে বিচারপূর্ব হাজতবাসের সময়কাল সাজার মেয়াদ থেকে সমন্বয় করা হবে এবং তারা আইন অনুযায়ী রেমিশনের সুবিধা পাবেন।
আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, দণ্ডিতদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হবে। আপিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর দণ্ডিতদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে এই অর্থ আদায় করা হবে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) তাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ ট্রাইব্যুনালে জমা দেবেন, যা পরে ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হবে।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল। আর আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. মেহেদী হাসান ও অ্যাডভোকেট মো. দিদার আলী।
রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট মো.বদিউজ্জামান চৌধুরী বাদল সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলামত পর্যালোচনা করে আদালত একটি ন্যায়সঙ্গত রায় দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার যে মানসিক ও আইনি লড়াই চালিয়েছেন, আজ তারা ন্যায়বিচার পেলেন। এই রায় সমাজ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।”
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মেহেদী হাসান জানান, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করা হবে। এরপর আইনি দিক বিবেচনা করে উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।