নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা ওয়াসার শতকোটি টাকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে উত্তরা ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় বাস্তবায়িত প্রায় ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় ছিল, যার ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রমতে, ইন্টারিম সরকারের সময় ঢাকা ওয়াসার অধীনে উত্তরা ও রূপগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য শর্ত সহজ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, টেন্ডার মূল্যায়নের সময় স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে অস্পষ্টতা ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন,
“আমরা নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি, মূল্যায়নের বিভিন্ন ধাপে অস্বচ্ছতা ছিল। এতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।”
ওয়াসার অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জি. শওকত মাহমুদ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, তিনি তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিন এ. খান-এর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে বড় অঙ্কের প্রকল্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“ওয়াসার বড় প্রকল্পগুলোতে কার প্রভাব কতটা—এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অনেকেই জানেন। তবে বিষয়গুলো প্রকাশ্যে খুব কমই আসে।”
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট ওই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক হারে সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে স্বাভাবিক আয়ের তুলনায় তার সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তার বিরুদ্ধে প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান তদন্তের অগ্রগতি দেখা যায়নি।
একজন আর্থিক আব্দুর রহমান মজুমদার বলেন,
“সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের উৎস নিয়মিত যাচাই করা হলে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা সহজেই নির্ধারণ করা সম্ভব।”
ওয়াসার সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, বড় অঙ্কের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তার মতে,“যদি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
উত্তরা ও রূপগঞ্জ প্রকল্প ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় শতকোটি টাকার প্রকল্পগুলো বারবার অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।