গাইবান্ধায় সম্পত্তি নিয়ে ভাই-বোনের দ্বন্দ্বে বাবার দাফন স্থগিত।
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
মৃত্যুর পর চিরবিদায়ের শেষ মুহূর্তটিতেও মেলেনি শান্তি। জমি ও পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ভাই-বোনের মধ্যে চরম বিরোধের জেরে আটকে গেছে এক বৃদ্ধ বাবার জানাজা ও দাফন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের বোয়ালিদহ বকশীগঞ্জ গ্রামে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মৃত ব্যক্তির নাম নাজির উদ্দিন বেপারী (৭৫)। গত রোববার (১১ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে ইদ্রিস আলী এবং এক মেয়ে হালিমা বেগমকে রেখে গেছেন।
স্বজনরা জানান, সোমবার সকাল ১০টায় নাজির উদ্দিনের নিজ বাড়ির আঙিনায় জানাজার সময় নির্ধারণ করে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল। কিন্তু জানাজা ও দাফনের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে বাধা হয়ে দাঁড়ান মেয়ে হালিমা বেগম। তাঁর অনড় অবস্থানের কারণে নির্ধারিত সময়ে দাফন কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি বিকেল ৪টা বেজে গেলেও বৃদ্ধের কাফন জড়ানো মরদেহ বাড়ির উঠানেই পড়ে থাকতে দেখা যায়।
মেয়ে হালিমা বেগমের অভিযোগ, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ভাই ইদ্রিস আলী কৌশলে বাবার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেন। এর ফলে তিনি পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। হালিমা বেগমের স্পষ্ট দাবি—সম্পত্তিতে তাঁর আইনি ও শরীয়তসম্মত অধিকার দলিলের মাধ্যমে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাবার দাফনে কোনোভাবেই সম্মতি দেবেন না।
এদিকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিনসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিক বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেন। এ সময় মীমাংসার উদ্দেশ্যে হালিমা বেগমকে নগদ দেড় লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কোনো প্রকার আর্থিক রফা নয়, বরং দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তিতে নিজের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি অনড় থাকেন।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন জানান, খবর পেয়ে তিনি নিজে উভয় পক্ষকে নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মেয়ের কঠোর অবস্থানের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ধাপেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শিপন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “সম্পত্তির জেরে মৃত বাবার মরদেহ আটকে রাখার ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক। বিষয়টি জানার পর থেকেই আমরা স্থানীয়ভাবে আপোসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সমাধান হলেই দ্রুত জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।”
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম হাবিবুর রহমান জানান, স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশ বিষয়টি জানতে পেরেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও সামাজিকভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইদ্রিস আলীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একদিকে কাফনে মোড়ানো বাবার শেষ বিদায়ের অপেক্ষা, আর অন্যদিকে ন্যায্য অধিকার আদায়ে মেয়ের আপসহীন অবস্থান—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা জুড়ে বর্তমানে এক থমথমে ও নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।