১৭ লাখের দেনমোহর কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার করার অভিযোগ, পাটগ্রামে কাজির দুই সহযোগী আটক, মুচলেকায় মুক্ত।
লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি
রওশন বাবু
০১৭২৫১৯২৪২৪
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে এক গৃহবধূর বিয়ের সময় নির্ধারিত ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেখানোর অভিযোগ উঠেছে নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কাজির দুই সহযোগীকে আটক করে স্থানীয়রা। পরে মুচলেকার মাধ্যমে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে পাটগ্রাম পৌরসভার মির্জারকোট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আটক দুজন হলেন- পাটগ্রাম উপজেলা বুড়িমারী আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ ও পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর সহযোগী আজাদ এবং একই এলাকার মামুন। আজাদ জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আতাউর রহমানের ছোট ভাই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের দালালপাড়া গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে অহেদ আলী ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পাটগ্রাম পৌরসভার মির্জারকোট এলাকার রিকশাচালক আশাদুল ইসলামের মেয়ে আরফিনা আক্তার মিমকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় দেনমোহর ১৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বিয়ে নিবন্ধনের পাশাপাশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি লিখিত চুক্তিও করা হয় বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর আরফিনা প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হলে তার গর্ভপাত করানো হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এরই মধ্যে নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ করে বিয়ের মূল দেনমোহর ১৭ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে ওই ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদালতে জমা দিয়ে আরফিনা আক্তার মিমকে তালাক দেন অহেদ আলী। তালাকের নোটিশ হাতে পেয়ে বিপাকে পড়ে পরিবারটি। পরে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় বিয়ের নকল (সনদ/রেজিস্ট্রির কপি) তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বুধবার রাতে নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর দুই সহযোগী আজাদ ও মামুন নকল নিয়ে আরফিনার বাড়িতে গেলে স্থানীয়রা তাদের আটকে রাখেন। এ সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে দেনমোহরের অঙ্ক পরিবর্তনের বিষয়টি তারা জনসম্মুখে স্বীকার করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন। পরে আপস-মীমাংসার মুচলেকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী শহিদুল ইসলাম বলেন, “গ্রামবাসী কাজির দুই সহযোগীকে আটক করেছিল। পরে আপস-মীমাংসার আশ্বাসে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বিয়ের সময় ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর লেখা থাকলেও পরবর্তীতে নকল কপিতে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা লেখা হয়েছে বলে আটক ব্যক্তিরা জনসম্মুখে স্বীকার করেছেন।”
বিয়ের ভলিউম বহির লেখক ও কাজির সহযোগী হাফিজুল ইসলাম বলেন, “৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিয়ে নিবন্ধনের কাজ আমি করি। ১৭ লাখ টাকা দেনমোহরের ওই বিয়েটিও আমি নিবন্ধন করেছি। মূল ভলিউমে অঙ্ক ও কথায় ১৭ লাখ টাকা লিখেছিলাম। এ বিয়ে নিবন্ধনের জন্য কাজি ইউনুস আলী ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। দেনমোহর কমানোর বিষয়ে কাজি ইউনুস আলীই বলতে পারবেন।
আটক সহযোগীদের একজন আজাদ বলেন, “কাজি ইউনুস আলীর নির্দেশে মূল ভলিউম বই দেখে নকল তৈরি করে নিয়ে এসেছি। জালিয়াতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কাজি ইউনুস আলী বলতে পারবেন। আমরা তার হয়ে শুধু লিখে দিই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও দেনমোহর সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলী ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি মাদরাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করায় বিয়ে নিবন্ধনের কাজ বেশ কয়েকজন সহযোগীর মাধ্যমে পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজি ইউনুস আলীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয়দের মাধ্যমে দেনমোহর জালিয়াতি ও দুই ব্যক্তিকে আটকের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে এ ঘটনায় এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, দেনমোহরের অঙ্ক পরিবর্তনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা।