ব্রিটিশের আতঙ্ক, সরাইলের গর্ব – বিপ্লবী উল্লাসকর দও।
তাছলিমা খন্দকার নুশরাত (স্টাফ রিপোর্টার)
ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ভারতের প্রথম বোমা মানব হিসেবে খ্যাত বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৮৮৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ গ্রামে। তার পিতার নাম দ্বিজদাস দত্তগুপ্ত।
:শিক্ষা জীবন ও বিপ্লবে যোগদান:
উল্লাসকর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন, পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজে পড়ার সময় ইংরেজ অধ্যাপক রাসেল বাঙালিদের সম্পর্কে কটূক্তি করায় তিনি তাকে জুতোপেটা করেন, এজন্য কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। এখান থেকেই তার জীবনে পরিবর্তন আসে এবং তিনি অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলে যোগ দেন।
তিনি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী যে বোমা দিয়ে মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন, সেই বোমাটি তৈরি করেছিলেন এই সরাইলের সন্তান উল্লাসকর দত্ত।
“আলিপুর বোমা মামলা ও কালাপানি:
আলিপুর বোমা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। দায়রা আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আপিলে হাইকোর্ট সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে (কালাপানি) পাঠান।
সেখানে তার উপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন – ইলেকট্রিক শক, অনাহার, একাকী বন্দিত্ব। মাথায় আঘাত করে তাকে পাগল করে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। এই নির্যাতনে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
:২০ বছরের কারাজীবন ও অমর প্রেম:
১৯২০ সালে রাজকীয় ক্ষমার অঙ্গ হিসেবে তিনি মাদ্রাজ উন্মাদাগার থেকে মুক্তি পান।
তার জীবনে রয়েছে এক অমর প্রেমকাহিনী। তার কিশোরবেলার প্রেমিকা ছিলেন বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র পালের কন্যা লীলা পাল। দীর্ঘ ৪০ বছর বিচ্ছেদের পর ১৯৪৮ সালে, ৬৩ বছর বয়সে তিনি সমস্ত সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে পক্ষাঘাতে পঙ্গু ও বিধবা লীলা পালকে বিয়ে করেন। বিপ্লবীরা শপথ নিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন না হলে বিয়ে করবেন না, সেই শপথ তিনি রক্ষা করেছিলেন।
“শেষ জীবন:
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তিনি তার নিজ গ্রাম কালিকচ্ছ (বর্তমান বাংলাদেশ) এ ফিরে আসেন। পরে ১৯৫১ সালে স্ত্রীকে নিয়ে আসামের শিলচরে চলে যান। সেখানেই অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে পঙ্গু স্ত্রীর সেবা করে জীবন কাটান। ভারত সরকারের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভাতা নিতে তিনি অস্বীকার করেছিলেন। ১৯৬২ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পরেও তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি ফিরে আসবেন, তাই দরজা খোলা রেখে ঘুমাতেন।
অবশেষে ১৭ মে ১৯৬৫ সালে কলকাতায় এই মহান বিপ্লবীর দেহাবসান ঘটে। তার লেখা “আমার কারাজীবন” ও “বারো বছরের কারাজীবন” বিপ্লবের ইতিহাসে অমূল্য দলিল।