সপ্তাহে একবার ডায়ালাইসিস, মাসে ৭৫ হাজার টাকা: বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে অসহায় আবু নাঈম
জমি বিক্রি ও ধারদেনা করে ছেলের চিকিৎসায় ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের; অসুস্থ মা-বাবা ও ভাইয়ের সংসারে থমকে যাচ্ছে চিকিৎসার পথ, সহায়তার আকুতি পরিবারের
মোঃ রুহুল আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : জীবনটা এখন হাসপাতালের বিছানা আর ডায়ালাইসিসের মেশিনের সঙ্গে বাঁধা। প্রতিটি দিন কাটে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে, প্রতিটি মাস শুরু হয় চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের দুশ্চিন্তা নিয়ে। তবু বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন চাঁদপুরের শাহরাস্তির যুবক মো. আবু নাঈম। সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশা তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকট। ছেলের চিকিৎসায় জমি বিক্রি, সঞ্চয় শেষ ও ধারদেনা করেও আর কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তাঁর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবা। পরিবারের দাবি, এ পর্যন্ত চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকারও বেশি। বর্তমানে সপ্তাহে একবার ডায়ালাইসিস করাতে মাসে প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা চেয়েছে পরিবারটি।
আবু নাঈম চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার মেহার দক্ষিণ ইউনিয়নের ভোলদিঘী মাদ্রাসাবাড়ির বাসিন্দা। মাওলানা নূরুল ইসলাম ও নাছিমা বেগম দম্পতির দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করা নাঈমের স্বপ্ন ছিল পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে মা-বাবার পাশে দাঁড়ানো। সেই স্বপ্ন নিয়েই ঋণ করে ২০২৩ সালের জুনে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু প্রবাসজীবনে পরিবারের হাল ফেরানোর পরিবর্তে নিজেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর সৌদি আরবে নাঈমের কিডনি রোগ শনাক্ত হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার দিন তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা নিতে হয়। একপর্যায়ে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়লে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন তিনি। এরপর থেকে দেশে চলছে তাঁর চিকিৎসা। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে তাঁকে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর নিয়োগকর্তা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করায় দেশে ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। দেশে ফেরার পর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে গিয়ে পরিবারটির আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ছেলের জীবন বাঁচানোর আশায় বাবা নূরুল ইসলাম নিজের সঞ্চয় ব্যয় করেছেন, জমি বিক্রি করেছেন এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করেছেন। কিন্তু চিকিৎসার ব্যয় থেমে নেই। মাসের পর মাস এই খরচ বহন করতে গিয়ে এখন নতুন করে অর্থের সংস্থান করাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
নাঈমের অসহায়ত্বের চিত্র আরও প্রকট হয়ে উঠেছে পরিবারের অন্য সদস্যদের অসুস্থতায়। তাঁর বাবা-মা দুজনই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন। বড় ভাই স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করলেও তিনিও অসুস্থ। ফলে পরিবারের উপার্জন ও চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য সীমিত। একদিকে ছোট ছেলের চিকিৎসা অব্যাহত রাখার তাগিদ, অন্যদিকে নিজেদের অসুস্থতা ও সংসারের ব্যয়—সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি পরিবারটি।
ভোলদিঘী কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন বলেন, নাঈম তাঁর প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে না গিয়ে বাবা-মাকে সহায়তা করতে সে বিদেশে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। নাঈমের বাবা-মা ও বড় ভাইও অসুস্থ থাকায় পরিবারের পক্ষে তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে সরকারি সহায়তার আশায় শাহরাস্তি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেছে পরিবারটি। কিডনি রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় এক লাখ টাকা পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। তবে আবেদনটির বর্তমান অবস্থা কিংবা সহায়তা অনুমোদনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বিবেচনায় আবেদনটি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে আবু নাঈম লিখেছেন, “জীবনটা এখন হাসপাতালের বিছানা আর ডায়ালাইসিসের মেশিনের সঙ্গেই কাটে। তবুও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি, সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। জানি না ভাগ্যে কী আছে, শুধু এতটুকু বিশ্বাস করি—আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে নিরাশ করেন না। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।”
নাঈমের এই আকুতি এখন শুধু একজন অসুস্থ যুবকের বেঁচে থাকার প্রত্যাশা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাওয়া একটি পরিবারের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাঁরা কারও করুণা চান না; বরং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা চান, যাতে নাঈমের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে না যায়।
সহযোগিতার আবেদন :
আবু নাঈমের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা দিতে আগ্রহী ব্যক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি, দানশীল মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পরিবার। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ব্যবহৃত বিকাশ নম্বর ০১৬৩১৫০৩৬৪৮। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির হিসাবে অর্থ পাঠানোর তথ্যও পরিবার জানিয়েছে।
ব্যাংক হিসাবের তথ্য:
হিসাবের নাম: আবু নাঈম
হিসাব নম্বর: ২০৫০৭৭৭০২৩৪৮২৯১৮৫
শাখা: এজেন্ট ব্যাংকিং
রাউটিং নম্বর: ১২৫২৭০৬০৭
সুইফট কোড: IBBL BDDDHFERD
যোগাযোগ: ০১৬৩১৫০৩৬৪৮
সহায়তা পাঠানোর আগে উল্লিখিত নম্বরে যোগাযোগ করে রোগীর চিকিৎসা, আর্থিক অবস্থা ও হিসাবের তথ্য যাচাই করে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পরিবার।
আবু নাঈমের স্বপ্ন, আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। সেই স্বপ্ন পূরণের পথ এখন নির্ভর করছে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যের ওপর। পরিবারের একার পক্ষে যখন ব্যয়ভার বহন করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে, তখন সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সম্মিলিত মানবিক সহায়তা তাঁর চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।