লালমনিরহাটে আমেনা হত্যা ও এসিড নিক্ষেপের বিচার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ।
লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি
রওশন বাবু
০১৭২৫১৯২৪২৪
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে গৃহবধূ আমেনা বেগমকে নির্যাতন ও যৌনাঙ্গে এসিড নিক্ষেপের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল এবং মহাসড়ক অবরোধ করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সড়ক অবরোধ করলে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লালমনিরহাট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে খাতাপাড়া বাজার এলাকার বাসিন্দাদের উদ্যোগে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে নিহত আমেনার স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
বিক্ষোভ চলাকালে বেশ কয়েকজন প্রতিবাদকারী হঠাৎ সড়কের ওপর শুয়ে পড়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। এতে উক্ত সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভকারীরা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর আমেনা বেগম মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। এই হত্যা মামলার আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ঘটনার একপর্যায়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি রওশন কবিরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এ সময় তারা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জোরালো আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর আদিতমারীর বড় কমলাবাড়ী এলাকার আফজাল হোসেনের সঙ্গে আমেনা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় স্বর্ণালংকার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি আড়াই লাখ টাকার জন্য আমেনার ওপর নিয়মিত অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালের ২ মার্চ রাতে যৌতুকের বাকি টাকার দাবিতে স্বামী আফজাল হোসেন আমেনার পরনের কাপড় তুলে তাঁর যৌনাঙ্গে এসিড নিক্ষেপ করেন। ওই সময় শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও তাঁকে মারাত্মকভাবে মারধর করেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়ভাবে এবং পরবর্তীতে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ২১ আগস্ট সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের ভাই মো. জাকির হোসেন আদিতমারী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন—প্রধান আসামি আফজাল হোসেন, তাঁর বাবা মুসা মিয়া, মা আছিয়া বেগম, ভাই আনোয়ারুল হক এবং মাহফুজা খাতুন। উল্লেখ্য, এর আগে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা বিচারাধীন ছিল, যা আমেনার মৃত্যুর পর হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
এদিকে, মামলার রিমান্ড ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে বাদীপক্ষ এবং আদালত-সংশ্লিষ্টদের মধ্য থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। বাদী মো. জাকির হোসেনের অভিযোগ, আসামিরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে এবং জজকোর্টের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগসাজশ করে জামিন লাভ করেছেন।
তাছাড়া মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে অনিয়ম, আসামিদের জামিনে সহযোগিতা এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কে এম হুমায়ুন রেজা স্বপনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বাদী। একই সাথে তিনি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পিপি অ্যাডভোকেট কে এম হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, “নারী ও শিশু আদালত আমার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আসামিপক্ষ সম্পূর্ণ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জজকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে। এ বিষয়ের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।
সামগ্রিক বিষয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।