রৌমারী সীমান্তে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে তিন যুবকের মানবেতর জীবন
রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ১৪ দিন ধরে অনিশ্চয়তার প্রহর
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্ট।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার রৌমারী সদর ইউনিয়নের ভুন্দুরচর সীমান্তে জিনজিরাম নদীর তীরঘেঁষা নো-ম্যান্স ল্যান্ডে টানা ১৪ দিন ধরে চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিন যুবক। মাথার ওপর নেই কোনো নিরাপদ আশ্রয়, নেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ। প্রচণ্ড রোদে পুড়ে, ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে, কখনো না খেয়ে, কখনো স্থানীয়দের দেওয়া সামান্য খাবারে বেঁচে আছেন তারা।
গত ১৪ জুন ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ওই তিন যুবককে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেয়নি। এরপর থেকে তারা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডেই অবস্থান করছেন। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে আটকে পড়ে কার্যত রাষ্ট্রহীন এক অনিশ্চিত জীবনের মধ্যে রয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথম তিন থেকে চার দিন তিন যুবক খোলা আকাশের নিচেই ছিলেন। তীব্র রোদে পুড়েছেন, আবার প্রবল বর্ষণে ভিজেছেন। তাদের এই অসহায় অবস্থা দেখে মানবিক কারণে স্থানীয়রা পলিথিন দিয়ে সাহায্য করেন। সেই পলিথিন দিয়েই একটি ছোট্ট অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে এখন সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।
স্থানীয়রাই নিয়মিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও খুব সীমিত। কারণ তিন যুবকের সামনে অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে বিজিবি, আর পেছনে অবস্থান নেয় বিএসএফ। ফলে স্থানীয়রা দূর থেকে কয়েক মিনিটের বেশি কথা বলতে পারেন না।
ভুন্দুরচর গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, “এটি অত্যন্ত দুর্গম সীমান্ত এলাকা। পাশেই জিনজিরাম নদী। ১৪ জুন থেকে তিন যুবককে এখানে অমানবিক পরিস্থিতিতে থাকতে হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েক দফা ঝড়-বৃষ্টিও হয়েছে। চাইলে তারা নো-ম্যান্স ল্যান্ড ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তারা আমাদের বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে চান।”
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা নুরনবী ইসলাম বলেন, “আমরা দূর থেকে তাদের সঙ্গে কথা বলি। সারাক্ষণ বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা পাহারা দেয়। এত কাছ থেকে একটি মানবিক বিপর্যয় দেখছি, অথচ কার্যত কিছুই করতে পারছি না। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।”
রৌমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রুহুল আমিন কয়েকবার নো-ম্যান্স ল্যান্ডে গিয়ে তিন যুবকের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “তিনজনই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের দুর্ভোগের কথা বলেছেন। কখনো কখনো না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। সামনে এগোলেও বিপদ, পেছনে ফিরলেও বিপদ। এমন অসহায় পরিস্থিতি আমি আগে দেখিনি।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন যুবক নিজেদের বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দাবি, তারা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। গত ১০ জুন দালালের মাধ্যমে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের পর তারা আটক হন। পরে ১৪ জুন ভোরে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে।
তিন যুবকের দেওয়া পরিচয় অনুযায়ী, তারা হলেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার কাউকান্দি গ্রামের জহিরুল ইসলাম (২৬), নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার সাওতা গ্রামের পারভেজ (২১) এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার কাউছিয়া গ্রামের নাঈম মিয়া (২২)।
রৌমারী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা নিয়মিত তাদের খোঁজখবর রাখছি। বিষয়টি আন্তর্জাতিক হওয়ায় স্থানীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “মানবিক কারণে স্থানীয় মানুষ খাবার ও পানি পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির সময় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। কাছে গেলেই তারা শুধু কাঁদেন।”
এ বিষয়ে জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “তিন যুবকের বিষয়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে বিএসএফকে কয়েকবার আহ্বান জানানো হলেও তারা সাড়া দেয়নি। যেহেতু বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তাই বিষয়টির সমাধানে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না তিন যুবক বাংলাদেশি কি না।’ একই সঙ্গে সীমান্তে পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং স্থানীয়রাও বিজিবিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন বলে জানান তিনি।
দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যবর্তী সরু এক টুকরো ভূমিতে আটকে থাকা এই তিন যুবকের প্রতিটি দিন যেন অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার। পরিচয় নিশ্চিত করা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবিক সমাধানের অপেক্ষায় তারা দিন গুনছেন ‘কবে শেষ হবে এই অবরুদ্ধ জীবন, কবে ফিরতে পারবেন আপনজনের কাছে।’