‘মাদকের নিরাপদ দুর্গ’ বদনাম ঘুচাতে জেগেছে নাওডাঙ্গাবাসী
‘মাদকের বিরুদ্ধে হই সচেতন, বাঁচাই প্রজন্ম, বাঁচাই জীবন’ স্লোগানে গণজাগরণ
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭৩
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন। একসময় কৃষি আর সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য পরিচিত এই জনপদ গত কয়েক বছরে পরিচিতি পেয়েছে ভিন্ন এক কারণে ‘মাদকদ্রব্যের নিরাপদ আস্তানা’ হিসেবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের কেনাবেচা ও পাচারকে কেন্দ্র করে ইউনিয়নটি এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত মাদককেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কেবল কুড়িগ্রাম নয়, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া এমনকি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মাদকসেবীরা নাওডাঙ্গায় আসে। বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মাদক মামলার বহু আসামির বাড়িও এই ইউনিয়নে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কয়েকটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব সিন্ডিকেট দরিদ্র পরিবারের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, এমনকি শিশুদেরও বিভিন্ন প্রলোভনে মাদক পরিবহন ও পাচারে ব্যবহার করছে। ফলে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
‘মাদকের বিরুদ্ধে হই সচেতন, বাঁচাই প্রজন্ম, বাঁচাই জীবন’ এই স্লোগান সামনে রেখে শনিবার বিকেলে ইউনিয়নের পাঁচটি স্থানে একযোগে মানববন্ধন, সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পরে একটি বর্ণাঢ্য র্যা লি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
কর্মসূচিতে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠনের সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, নাওডাঙ্গাকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাদকাসক্ত যুবক জানান, মাদক সংগ্রহের জন্য নাওডাঙ্গা দীর্ঘদিন ধরেই একটি পরিচিত স্থান।
তাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক না পাওয়া গেলেও নাওডাঙ্গায় সহজেই পাওয়া যায়। এখানকার বহু মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মাদক বিক্রির অর্থে অনেকের আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে। অনেকে রংপুর ও ঢাকায় বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ইউনিয়নের বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্তদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
তাদের অভিযোগ, নাওডাঙ্গার মানুষের সঙ্গে এখন অনেকেই বৈবাহিক সম্পর্ক গড়তে চান না। কারণ ইউনিয়নটি ‘মাদকের এলাকা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়েছে। এই সামাজিক কলঙ্ক মুছে ফেলতেই এখন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
প্রবীণ বাসিন্দা আনসার আলী বলেন, “মাদক শুধু আমাদের তরুণদের ধ্বংস করেনি, পুরো ইউনিয়নের সম্মানও নষ্ট করেছে। এই বদনাম আর বইতে চাই না।”
তিনি জানান, স্থানীয়দের উদ্যোগে গত কয়েকদিন ধরে ইউনিয়নে প্রবেশকারী অপরিচিত ব্যক্তিদের মোটরসাইকেল ও দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে। সন্দেহজনক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এ কাজে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সহযোগিতা করছেন। কয়েকজন মাদকাসক্তকে আটক করে গণধোলাই দেওয়ার পর তাদের কাছ থেকে মাদক পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, বাইরের মাদকসেবীদের আনাগোনা বন্ধ করা গেলে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে এবং একসময় এ অবৈধ ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান মুসাব্বের আলী মুসা বলেন, “ইউনিয়নে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই নাওডাঙ্গাকে মাদকমুক্ত করে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা।”
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, “বাইরে গেলে আমাদের ইউনিয়নের নাম শুনে মানুষ নেতিবাচক মন্তব্য করে। এতে খুব খারাপ লাগে। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি না। তাই আমরা সবাই একসঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ, নাওডাঙ্গাকে মাদকমুক্ত করব।”
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির সামছুল হুদা বাবুল বলেন, “আমরা সবাই রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে মাদকের বিরুদ্ধে এক হয়েছি। আগে যদি এমন উদ্যোগ নিতে পারতাম, তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এখন আর কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকাসক্তকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ধারাবাহিক নজরদারির কারণে ইতোমধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগের মতো মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে মাদকসেবীদের আসা অনেকটাই কমেছে। পুলিশ ও বিজিবিও আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করছে।”
বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান সরকার বলেন, “মাদকের কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। তাই আমরা বিদ্যালয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছি।”
কলেজ শিক্ষক ও সাংবাদিক অলিউর রহমান নয়ন বলেন, “মাদকের ছোবলে আমাদের ইউনিয়নের বহু তরুণ অকালে প্রাণ হারিয়েছে। অসংখ্য পরিবারে অশান্তি নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা এই মাদক সাম্রাজ্য একদিনে ভাঙা সম্ভব নয়। তবে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে ধীরে ধীরে এই দুর্গ ভেঙে পড়বে, আর নাওডাঙ্গা একদিন অবশ্যই মাদকমুক্ত হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু জনসচেতনতা নয়, মাদক কারবারের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত তৎপরতা নিশ্চিত করা গেলে নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন ধীরে ধীরে মাদকের কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে।