মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৫২ অপরাহ্ন
Headline :
লালমনিরহাটে এসএসসি ও সমমানের পরিক্ষার ফলাফলে ব্যাপক ধস,জনমনে উঠেছে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন। আহমুদুল হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, লালমনিরহাট শিরোনাম- আমি নারী আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যুদ্ধা সংসদের সদস‍্য সচিব এমএ রউফের তনয়া তাহরিন রানিছা রউফ এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ায় অভিনন্দন হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজঃ গজারিয়ায় অস্ত্রের মুখে জিম্মি, ১৫ লাখ টাকার ডাকাতি মোঃ দুলাল সরকার গজারিয়া প্রতিনিধি বাংলাদেশ: জুলাইয়ের আগে ও পরে ড. শেখ আকরাম আলী Hacked By Tempix 0day দি আরামকোর শিল্প অগ্নিনির্বাপণ কোম্পানির জাজান শোধনাগারের একটি স্থাপনায় লেগে যাওয়া আগুন নিয়ন্ত্রণে জানিয়েছে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়। মো লুৎফুর রহমান রাকিব আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি। পঞ্চগড়ে OMS ও ত্রাণের চাল বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ এসএসসি পরীক্ষায় ময়মনসিংহ বিভাগে পাশের হার ৫৭.৩৯ শতাংশ, জিপিএ ৫ প্রাপ্ত পরীক্ষার্থী ৫,৭০০ মকবুল হোসেন, সিনিয়র রিপোর্টার

বাংলাদেশ: জুলাইয়ের আগে ও পরে ড. শেখ আকরাম আলী

Update : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশ: জুলাইয়ের আগে ও পরে

ড. শেখ আকরাম আলী

২০২৪ সালের জুলাই মাসকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মোড় এবং সোনালী অক্ষরে লেখা দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সমর্থনে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে এবং তারপর থেকে ভারত কার্যত বাংলাদেশের মানুষের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবের মতো একজন জাতীয়তাবাদী নেতাও ভারতের আধিপত্যবাদী প্রভাব থেকে রেহাই পাননি, বরং ক্ষমতার স্বার্থে তাকে তা মেনে নিতে হয়েছিল। তিনি মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সমাজে ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি’ হিসেবে এক কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করেন। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ সৃষ্টির পুরো কৃতিত্ব নিজের করে নেয়। অথচ, দোসরদের বাইরে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনতা অর্জনে অবদান ছিল। কিন্তু পরিশেষে তিনি নিজের ভুলের শিকার হন, যা ১৯৭৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝিতে তার দুঃখজনক পতনের দিকে নিয়ে যায়।

অনেক গবেষক মনে করেন, শেখ মুজিব একজন ভালো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, কিন্তু ভালো প্রশাসক ছিলেন না। তিনি দেশের মানুষকে স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করতে সফল হয়েছিলেন, কিন্তু কখনই স্বাধীনতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। এটাও সত্য যে, তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পর তিনিই হন দেশের শীর্ষ নেতা।

দলীয় নেতৃত্বের ভেতরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বীজ শুরু থেকেই রোপিত হয়েছিল এবং দলের মধ্যকার কট্টরপন্থী দলগুলো তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি এবং অসন্তোষের পাশাপাশি দলের ভেতরের নেতৃত্ব সংকট শেষ পর্যন্ত তার পতন ত্বরান্বিত করে। এরপর জিয়াউর রহমানের উত্থানের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যিনি বাংলাদেশের মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

তিনি তার কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনেন, শক্ত হাতে দুর্নীতি দমন করেন এবং একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা। বাংলাদেশের মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল, কিন্তু খুব শীঘ্রই এরশাদের শাসনামলে চরম দুর্নীতির অভিজ্ঞতা অর্জন করে। মানুষ গণতান্ত্রিক চর্চার বিনিময়ে উন্নয়ন দেখেছে এবং এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরও ভালো দিনের আশা করেছিল।

২০০৬ সাল পর্যন্ত গণতন্ত্র কোনোভাবে টিকে ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের মানুষ আবারও বড় পরিসরে ভারতের আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণের পুনরাবৃত্তি দেখতে পায়—যা ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আসা রাজনৈতিক পরিবর্তন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের আগে বাংলাদেশের মানুষ যে স্বাধীনতা হারিয়েছিল, অবশেষে তারা তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে।

জুলাই বিপ্লব এক মহা বিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সমাজের কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর অবদান ছিল না, বরং তা ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত ও নিবেদিত প্রচেষ্টার ফল। অনেকেই একে বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে গণ্য করেন। ১৯৭১ সাল দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, আর ২০২৪ সালের জুলাই সেই স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেছে। অন্য কথায়, এটি কেবল একটি শাসনের পতনই ঘটায়নি, বরং ভবিষ্যতে সমাজে সাম্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রের সঠিক চর্চার স্বপ্ন দেখতে মানুষকে উৎসাহিত করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ গণতন্ত্রের এক নতুন যাত্রা শুরু করেছে।

কিন্তু সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষকে হতাশ করেছে। এটি কেবল ক্যাম্পাসের কোন্দল নয়, বরং সমাজে বিদ্যমান বৃহত্তর বিভাজনেরই ইঙ্গিত দেয়। জুলাই বিপ্লব নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব দাবির প্রতিযোগিতা একেবারেই সমীচীন কোনো উদ্যোগ নয়; এটি ছিল জনগণের বিজয়।

প্রতিটি বিপ্লবই সর্বদা জনগণের উদ্যোগের ফসল এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। জুলাইয়ের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপনের সময় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের সামনে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তাও জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যকার অসুস্থ সম্পর্কের বার্তা দেয়।

অন্যদিকে, ‘জুলাই সনদের’ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী শিবির বিভাজিত বলে মনে হচ্ছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সনদ বাস্তবায়নে তাঁর সরকারের অবস্থান স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তবুও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কিছু ঘটেনি। বিরোধী দল এটি দ্রুত বাস্তবায়িত দেখতে চায়, অন্যথায় আন্দোলন শুরু করতে তারা দ্বিধা করবে না।

জুলাই সনদে সবাই একমত হলেও এখন সংবিধান পরিবর্তনের ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান সংবিধানের ভেতরেই প্রয়োজনীয় সংশোধন নাকি ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়া উচিত—তা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর তর্ক-বিতর্ক চলছে। এটি কেবল রাজনৈতিক বিতর্কই নয়; বরং রাজনৈতিক অঙ্গীকার, গণভোট এবং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন।

দুই বছর আগে যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল এবং যা জুলাইকে একটি সফল বিপ্লবে রূপ দিয়েছিল, তাতে এখন কিছুটা ফাটল পরিলক্ষিত হচ্ছে। সব অংশীদারই রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে একমত হয়েছিলেন।

দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মতপার্থক্যগুলো যদি অমিমাংসিত থেকে যায়, তবে পরিস্থিতি কেবল জটিলই হবে না, একই সাথে এর বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে। এতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে পারে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

জুলাই সনদ কি শুধুই একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নাকি এটি রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি বাধ্যতামূলক রূপরেখা—তা একটি মূল প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি যদি কেবলই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হয়, তবে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু এটি যদি নতুন রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে বিপ্লব-উত্তর কোনো বন্দোবস্ত হয়ে থাকে, তবে এর দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সব অংশীদারের ঐক্য বজায় রাখা অপরিহার্য।

জুলাই বিপ্লবের আগে বাংলাদেশ সরকারের ওপর ভারতের একক কর্তৃত্ব ছিল, কিন্তু জুলাইয়ের ফলাফলে তারা তা হারিয়েছে। যদিও এটি বাস্তবতা যে, প্রতিবেশী হিসেবে নানা কারণে উভয় দেশেরই একে অপরের সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। দুটি দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত সমান মর্যাদার ভিত্তিতে, কিন্তু ভারত কেবল আওয়ামী লীগের সাথেই সুসম্পর্কে বিশ্বাসী, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে নয়।

৫ই আগস্টে হাসিনায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তবে ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে তাকে এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্যোগ থেকে বিরত না রাখার দায় তারা এড়াতে পারে না। এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার এক অসৎ উদ্দেশ্যে ভারত ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করার চেষ্টা করছে, যাতে তারা বন্ধুর ছদ্মবেশে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

‘র’ (RAW)-এর প্রধান পরাগ জৈন এখন ঢাকায় কেন? তিনি নিশ্চয়ই কোনো নির্দিষ্ট মিশন নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সাথে বৈঠক শেষে তিনি ঢাকা ত্যাগও করেছেন। তার এই সফরের উদ্দেশ্য জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। শেখ হাসিনা এবং আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে গুরুতর কিছু থাকতে পারে। অবশ্য আদালতের রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে বাংলাদেশের মানুষও প্রস্তুত রয়েছে।

দেশের মানুষ, বিশেষ করে জুলাই যোদ্ধাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুদের চলাফেরা সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত। বিপ্লব-পরবর্তী সময়টি বিপ্লবের সময়কালের চেয়েও বেশি নাজুক। তবে জনগণের ঐক্য যেকোনো দিক থেকে আসা হুমকিকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। যেকোনো মূল্যে জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া জাতির সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: আইন শাস্ত্রের অধ্যাপক

১১ আগস্ট ২০২৬


More News Of This Category