’নদীভাঙন হামাকগুলা শ্যাষ করি ফ্যালবার নাইকছে’
মানববন্ধনে ভাঙনকবলিত মানুষদের কান্না
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
নদীভাঙন থেকে রক্ষার দাবিতে আয়োজিত মানব বন্ধনে অংশ নেন সুলতানা বেগম (৩৫)। তার সাথে ছিলো স্বামী রফিকুল ইসলাম (৪০) ও তাদের তিন সন্তান। সুলতানার চোখজুড়ে ছিলো অশ্রু। মুখ দিয়ে তেমন কথা বলতে পারছিলেন না। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে বল্লেন,’ নদীভাঙন হামাকগুলা শ্যাষ করি ফ্যালবার নাইকছে। হামাকগুলাক বাঁচান। নদীত হামার জমিও যাবার নাইকছে বাড়িও যাবার নাইকছে। ছওয়াপোয়া নিয়া এ্যালা হামরা কোনঠে যামো। হামাক বাঁচান।’
একই মানব বন্ধনে অংশ নেওয়া ভাঙনকবলিত রাশেদা বেগম (৫৫) কাঁদছিলেন নীরবে। কোনরকমে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে বল্লেন,’ নদী ভাঙতে ভাঙতে হামাকগুলাক ফকির বানে ফ্যালাইছে। আবাদি জমি গ্যাইছে, ফলের বাগান গ্যাইছে। এ্যালা খালি বাড়িভিটা আছে তাকোও আস্তে আস্তে নদীত যাবার নাইকছে। বাড়িভিটা কোনা নদীত গ্যাইলে হামাকগুলাক ভিক্ষা করি ভাত খাওয়া নাইকবে।’ ’কাইও হামার খোঁজ নেয়না। সবাইগুলা খালি খালি আইসে আর দ্যাখি যায়। এ্যালাই কাইও নদী আর বান্ধি দিবার নাইকছে না,’ তিনি বলেন।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার পাইকডাঙ্গা এলাকায় দুধকুমার নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে। নদে পানি বাড়ার সাথে সাথে গেল তিন সপ্তাহধরে ভাঙন চলছে। প্রতিদিন নদের উদরে চলে যাচ্ছে বসতভিটাম আবাদি জমি, ফলের বাগান ও নানা স্থাপনা।
সুলতানার স্বামী রফিকুল ইসলাম বলেন, গেল তিন সপ্তাহে তাদের চার বিঘা আবাদি জমি দুধকুমার নদের উদরে বিলীন হয়েছে। ২০ শতাংশ জমির একটি কলা বাগানও নদে বিলীন হয়েছে। ভাঙন হুমকিতে পড়েছে আরো ৭ বিঘা আবাদি জমি ও বসতভিটা। গেল কয়েকদিনে এই গ্রামের কমপক্ষে ২০টি বসতভিটা ও ৮০ বিঘার বেশি আবাদি জমি নদের উদরে চলে গেছে। ‘দুথকুমার নদ যেভাবে ভাঙন শুরু করেছে তাতে আগামি কয়েকদিনে আমাদের গ্রামটি মানচিত্র থেকে মুছে ফেলবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছি কিন্তু ভাঙনরোধে নেওয়া হচ্ছে না কোন ব্যবস্থা,’ তিনি বলেন।
শনিবার বিকেলে একযোগে পাইকডাঙ্গা, রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট, উলিপুর উপজেলার পশ্চিম বজরা এবং রবিবার সকালে রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা এলাকায় মানব বন্ধন করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আয়োজনে মানব বন্ধনে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা ও তিস্তা নদীর ভাঙনকবলিত পরিবারের লোকজন অংশ নেন।
উলিপুর উপজেলার পশ্চিম বজরা এলাকার ভাঙনকবলিত কৃষক আমজাদ হোসেন (৫৫) জানান, নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ধীরে ধীরে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারন করছে। গেল এ সপ্তাহে তাদের গ্রামে ১০টি বসতভিটা ও ৪০ বিঘার বেশি আবাদি জমি তিস্তা নদীর উদরে বিলীন হয়েছে। ‘আমার বসতভিটা ভাঙন হুমকিতে পড়েছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমাদের গ্রামের অনেক বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যাবে,’ তিনি বলেন।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান,’ কুড়িগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভানকবলিত লোকজন মানব বন্ধন করে ভাঙন ঠেকানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানাচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করে কোন কোন ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’ ‘নদীভাঙনের কারনে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পরিবার বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে ভূমিহীন নি:স্ব হচ্ছে। জীবিকার জন্য তাদেরকে চরম দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে,’ তিনি বলেন।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন অফিস সুত্র জানায়, গেল ১জুন থেকে ২০জুন পযর্ন্ত কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা ও গঙ্গাধর নদীপাড়ের প্রায় ৩০টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ৮৫টি বসতভিটা ও ২০০ বিঘার বেশি আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। চারটি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র আকার ধারন করেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপুর্ণ ভাঙনকবলিত স্থান চিহ্নিত করে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে প্রাথমিকভাবে ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ’বরাদ্দ না থাকায় তাৎক্ষনিক সবস্থানে ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে আমরা চেষ্টা করি দ্রুত বরাদ্দের ব্যবস্থা করে ভাঙন ঠেকাতে কাজ শুরুর,’ তিনি বলেন।