লালমনিরহাটে মাদক অভিযান ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে তিন কর্মকর্তা
মোঃসেলিম মিয়া লালমনিরহাট জেলা সংবাদদাতা
লালমনিরহাটে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে আটক ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অপর এক যুবককে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, উদ্ধার করা হেরোইনের পরিমাণ কম দেখানো এবং মামলার সাক্ষী নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিবাদ করায় স্থানীয় এক চৌকিদারকে লাঞ্ছিত ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে অধিদপ্তরের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তারা হলেন লালমনিরহাট জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এসআই মশিউর, এসআই সৌরভ ও এএসআই শাহ আলম। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন তদন্তে সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের জাহাঙ্গীর মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে হেরোইনসহ মো. হেলাল (৩২) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তিনি বসুন্ধরা এলাকার সাব্বির হোসেনের ছেলে। পরে দিবাগত রাত ১টা ৪০ মিনিটের দিকে লালমনিরহাট পৌরসভার বত্রিশ হাজারি স্কুল মোড় এলাকায় জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে আবু তালেব মিয়া নামের এক চৌকিদারকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অভিযানে উদ্ধার করা হেরোইনের পরিমাণ বেশি হলেও তা জনসমক্ষে ওজন করা হয়নি। কর্মকর্তারা নিজেরাই ওজন করে মামলার এজাহারে পাঁচ গ্রাম হেরোইনের কথা উল্লেখ করেন। তবে উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ ও ওজনের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযানের সাক্ষী নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে লোকজন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও এক স্থানীয় সংবাদকর্মীকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। একইভাবে অটোরিকশা চালক শামীমকে সড়ক থেকে ডেকে এনে মামলার সাক্ষী করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁরা কেউই মাদক উদ্ধারের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না।
এ ছাড়া আটক হেলালের সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় অপর এক যুবককে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই যুবকের পরিচয় ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা মামলার এজাহারে আটকের স্থান হিসেবে সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের জাহাঙ্গীর মার্কেটের মেসার্স মিজান ফার্টিলাইজার শপের সামনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয় মুদি দোকানি আরিফুল ইসলাম ও সেলুন ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানান, ২০ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে ওই মার্কেটের সামনে কোনো অভিযান পরিচালনা বা কাউকে গ্রেপ্তারের ঘটনা তাঁদের চোখে পড়েনি।
স্থানীয়দের দাবি, এজাহারে উল্লেখ করা স্থান থেকে প্রায় ২০০ গজ পূর্বে নির্জন এলাকায় মাদক উদ্ধারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এজাহারে উল্লেখ করা স্থান ও স্থানীয়দের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় অভিযানের প্রকৃত স্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চৌকিদার আবু তালেব মিয়ার অভিযোগ, আটক ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অপর যুবককে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ করায় এবং বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানানোর কারণে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন। তাঁর দাবি, এসআই সৌরভসহ তিন কর্মকর্তা তাঁর শার্টের কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন। এ সময় তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং হাতকড়া পরানোর ভয় দেখানো হয়।
অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে তাঁদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।
লালমনিরহাট জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহাদাত হোসেন অর্থের বিনিময়ে কোনো আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, মাদকসহ একজনকেই আটক করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চৌকিদারকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলেও জানান।
উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ, অভিযানের স্থান, মামলার সাক্ষী নির্বাচন এবং আটক ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অপর যুবকের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।