শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ পূর্বাহ্ন
Headline :
লুঙ্গি ফেলে শিক্ষকের দৌড়! নেপথ্যে কী কারণ? গাইবান্ধায় বাস-মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ: চালক নিহত, আহত ৫ ভ্যান হারিয়ে কাঁদা রেজওয়ানের মুখে হাসি ফুটালো সৈয়দপুর উপজেলা প্রশাসন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারলে সরকারের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাবে আকাশ সমান! আদিতমারীতে অবৈধ সার বিক্রির দায়ে দুইজনকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা। লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি ব্রহ্মপুত্রের বুকে দুর্গম চর ঢুষমারা স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন কলেজ শিক্ষার্থী মুক্তা ফুলের গন্ধ মাখি তাছলিমা আক্তার মুক্তা মনোহরগঞ্জের বাইশগাঁও ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠন উদ্যোগে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষৃঠাবার্ষিকী পালিত ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়নে আইডিবির সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি মামলা তুলে নিতে বাদী-সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ।

ব্রহ্মপুত্রের বুকে দুর্গম চর ঢুষমারা স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন কলেজ শিক্ষার্থী মুক্তা

Update : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ব্রহ্মপুত্রের বুকে দুর্গম চর ঢুষমারা
স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছেন কলেজ শিক্ষার্থী মুক্তা

আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্ট
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত চর ঢুষমারা—যেখানে পৌঁছাতে ডিজেলচালিত নৌকায় সময় লাগে অন্তত ৪০–৫০ মিনিট। নদের স্রোত, অনিশ্চিত আবহাওয়া আর বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান এখানকার জীবনকে করে তুলেছে কঠিন।
চরের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ১৭০ জন শিক্ষার্থী। অথচ শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দু’জন। প্রধান শিক্ষক ব্যস্ত থাকেন প্রশাসনিক কাজে, অন্যদিকে সহকারী শিক্ষককে সামলাতে হয় সব শ্রেণি। ফলে পড়াশোনা প্রায় থমকে গিয়েছিল।

চরেরই মেয়ে, ২৩ বছর বয়সী মন্জু আরা খাতুন মুক্তা—চিলমারী মহিলা কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
২০২২ সালে এইচএসসি পাস করার পর তিনি নিজ উদ্যোগে, কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠদান শুরু করেন। সকাল ১০টায় ঠিক সময়ে তিনি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হন। বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির সব বিষয় পড়ান তিনি।

“চরের শিশুরা যদি স্বপ্ন দেখতে শেখে—সেটাই আমার প্রাপ্তি” মুক্তা বলেন। “শিক্ষকের অভাবে শিশুরা পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়ছিল। তাই আমি এগিয়ে এসেছি। যতদিন চরে থাকব, ততদিন বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়ে যাব। ওরা যদি শিক্ষিত হতে পারে—সেটাই আমার আনন্দ।”

নিজেও সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পড়াশুনা করছেন মুক্তা। চর কোদালকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চর কড়াই বরিশালে, এরপর এসএসসি চর কোদালকাটি বালিকা বিদ্যালয় থেকে। এইচএসসি চর রাজিবপুর কলেজে। এখন ডিগ্রি—চিলমারী সরকারি মহিলা কলেজে।
চর থেকে কলেজে যেতে একদিনে নৌকা ভাড়া ৫০ টাকা, রিকশা ভাড়া ৫০ টাকা—মোট ১০০ টাকা খরচ।
বাবা মন্জু মিয়া চাষি, মা শাহীনুর গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মেঝো মেয়ে মুক্তা। সচ্ছলতা নেই, আছে শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

মুক্তা বলেন, “দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তেই হয়। কিন্তু পড়াশোনা ছাড়িনি কখনো। এই সংগ্রামই আমাকে শিশুদের পাশে দাঁড়াতে শিখিয়েছে।”

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কুলসুম খাতুন জানায়, “মুক্তা আপা খুব যত্ন করে পড়ান। আমরা তার ক্লাস মিস করি না।”
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল বলে, “মুক্তা আপা ইংরেজি খুব সহজ করে শেখান।”

শিক্ষার্থীর অভিভাবক কফিল উদ্দিন জানান, মুক্তা না আসলে হয়তো চর ঢুষমারার বহু শিশুই পড়াশোনা থেকে ছিটকে যেত। কিন্তু এখন তারা নিয়মিত স্কুলে আসে—স্বপ্ন দেখে উচ্চবিদ্যালয়ে যাওয়ার।
তিনি বলেন, নিঃস্বার্থ সেচ্ছাশ্রমে পাঠদান করে মুক্তা ব্রহ্মপুত্রপাড়ের শিশুদের সামনে খুলে দিচ্ছেন শিক্ষার নতুন দরজা। দুর্গম চর ঢুষমারায় তিনি এখন শিক্ষার আলো নিয়ে হেঁটে চলা নীরব বিপ্লবের এক তরুণী।

“মুক্তা না থাকলে বিদ্যালয়ে মিশুদের নিয়মিত পড়ানো সম্ভব হতো না”, বলেন সহকারী শিক্ষক মহসিনা বেগম। “আমি প্রতিদিন ৪০–৫০ মিনিট নৌকা পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাই। মাঝে মাঝে দেরি হয়। মুক্তা ঠিক সময়েই এসে ক্লাস শুরু করে। সে না থাকলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান অসম্ভব ছিল,’ তিনি বলেন। ‘আমি মুক্তাকে যতসামান্য আর্থিক সহযোগিতা করতে চাই কিন্তু সে কখনই তা গ্রহন করতে রাজি হয় না,’ তিনি বলেন।

প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান জানান, “বিদ্যালয়ে আটটি পদের ভেতর মাত্র দুইজন শিক্ষক আছেন। বহুবার আবেদন করেও শিক্ষক পাওয়া যায়নি। মুক্তার সেচ্ছাশ্রমে পাঠদান এখন বিদ্যালয়ের ভরসা।”

চিলমারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, “দুর্গম এলাকা হওয়ায় কেউ পোস্টিং নিতে চান না। পোস্টিং দিলেও বদলি নিয়ে চলে যান। মুক্তাকে সরকারিভাবে সহায়তার সুযোগ নেই, তবে ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করা যেতে পারে।”


More News Of This Category