শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৫ অপরাহ্ন
Headline :
লালমনিরহাটে অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব পরিবার, পাশে দাঁড়ালেন ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। দিন কাটে স্কুলে, রাত কাটে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গৃহহীন নাঈমের স্বপ্ন -পড়াশোনা করে একদিন মানুষ হবে। মাদরাসা নিবন্ধন নীতির প্রতিবাদে ১০ দফা দাবিতে ইসলামী সংগঠনগুলোর সমাবেশ। গাইবান্ধা আদালত প্রাঙ্গণের প্রধান ফটকে হামলার অভিযোগ, সরকারি বালক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ট্রেইনারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ। এদিকে ফুলছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, “আগামী রোববার ঘটনাস্থলে সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ধর্মপাশা উপজেলা কমিউনিটি পুলিশিং-এর পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। মিঠামইন উপজেলা বিএনপি সভাপতি জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীরকে হত্যা

অজেয় ইতিহাসের দুই মহানায়ক: বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া।

Update : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

​— মানিক লাল ঘোষ
​বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কয়েকজন মহান ব্যক্তি নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন ধ্রুবতারা। সাংবাদিকতাকে তিনি কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং শোষিত মানুষের মুক্তির হাতিয়ার ও রাজনৈতিক সংগ্রামের শাণিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একনিষ্ঠ সমর্থক ও অভিভাবক হিসেবে তিনি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন।
​১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মানিক মিয়ার সাংবাদিকতা জীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল অবিভক্ত ভারতের কলকাতায়, ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকার মাধ্যমে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে থেকে তিনি সাংবাদিকতার প্রকৃত দীক্ষা লাভ করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং সাপ্তাহিক ইত্তেফাক সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর, ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর মানিক মিয়া ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের প্রধান মুখপত্র। ইত্তেফাক কেবল একটি সংবাদপত্রের নাম ছিল না, এটি ছিল বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। পরবর্তীতে তিনি ‘ঢাকা টাইমস’ ও ‘পূর্বাণী’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করে সাংবাদিকতার পরিধি আরও বিস্তৃত করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন, যা ছিল তার পেশাগত শ্রেষ্ঠত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
​মানিক মিয়া সাংবাদিকতাকে রাজনীতির সমান্তরালে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজনীতির মূল ধারায় সরাসরি সক্রিয় না থেকেও তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালের এক বিশাল রাজনৈতিক শক্তি। তার লেখা কালজয়ী কলাম ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ছিল তৎকালীন শোষক শ্রেণির আতঙ্ক। আইয়ুব খানের সামরিক সরকারও তার লেখনীর তেজ ও জনমতের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়ত। তিনি এমনভাবে জনমত গড়ে তুলতেন যে, সাধারণ মানুষ ইত্তেফাককে তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর মনে করত।
​বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মানিক মিয়ার সম্পর্ক ছিল গভীর ও আদর্শিক। বঙ্গবন্ধু বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন, আর বাইরে মানিক মিয়া ইত্তেফাকের লেখনী দিয়ে আন্দোলনের পক্ষে জনমত তৈরি করেছেন। আইয়ুব খানের দুঃসময়ে যখন অনেকে ভয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন, তখন মানিক মিয়া অভিভাবকের মতো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার আত্মস্মৃতিতে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিক মিয়ার লেখনী ও পরামর্শই ছিল তার সাহস ও দিকনির্দেশনার প্রধান উৎস। ছয়দফা আন্দোলনকে জনপ্রিয় গণআন্দোলনে রূপ দেওয়ার পেছনে মানিক মিয়ার সাংবাদিকসুলভ দূরদর্শিতা ছিল অনস্বীকার্য। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়াকেই তার রাজনৈতিক অভিভাবক ও পরম বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সবসময় বিশ্বাস করতেন, মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক না থাকলে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও স্বকীয়তা রক্ষা করা অসম্ভব হতো।
​১৯৬৯ সালের ১ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে এই মহান সম্পাদকের অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যু বঙ্গবন্ধু ও পুরো জাতিকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়ার মৃত্যুকে কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু হিসেবে দেখেননি, বরং একে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য করতেন। কারণ, তিনি জানতেন যে মানিক মিয়ার মৃত্যুতে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা ও আন্দোলনের পথচলায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
​আজ ইতিহাসের আয়নায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কেবল একজন কিংবদন্তি সম্পাদক নন; তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনা গড়ার অন্যতম প্রধান স্থপতি এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অন্যতম অবিচ্ছেদ্য সহযোদ্ধা। তার নীতি-আদর্শ ও লেখনী আজও সাংবাদিকতা পেশার নতুন প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে আছে।
​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)


More News Of This Category