সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন
Headline :
লিচু দেওয়ার প্রলোভনে শিশুকে ভুট্টাখেতে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা, বখাটে যুবক গ্রেফতার। যেসব কারণে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের মান-মর্যাদা। রংপুর জেলা পুলিশের ডিবি’র অভিযানে মিঠাপুকুরে ৫৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার, ০১ (এক) জন মাদক কারবারি আটক রুবিওর দিল্লি সফরে ট্রাম্পের ফোন: ‘ভারত যা চায় তাই পাবে’ — বাংলাদেশ ইস্যুতে কী বোঝাপড়া? মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও দালিলিক প্রমান। প্রবীন রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলামের প্রয়ানে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠনের শোক প্রকাশ জিয়ার হ্যাঁ/না ভোটরঙ্গ : ভোটারদের অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতে চামড়া পাচার রোধে হিলি সীমান্তে বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা, টহল জোরদার। আমতলীতে ৬৯৯ পরিবারের মাঝে ইসলামিক রিলিফের কুরবানির মাংস বিতরণ।

মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও দালিলিক প্রমান।

Update : সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজঃ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র লীগের সাবেক শিক্ষার্থী ও সংগঠক রাব্বি হাসানের লেখা থেকে এবিষয় নিয়ে তথ্য তুলে আনা হয়েছে ।
মুজিব বাহিনী:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির জীবনে এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায়। এই যুদ্ধে শুধু নিয়মিত মুক্তিবাহিনী নয়, অসংখ্য গেরিলা বাহিনী আত্মত্যাগ ও বীরত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম ও বিশেষায়িত ছিল মুজিব বাহিনী, যা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) নামেও পরিচিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উদ্দীপিত এই বাহিনী মূলত ছাত্র ও তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল এবং মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে।

মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব:
মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, যিনি এই বাহিনীর প্রধান সেনাপতি (কমান্ডার-ইন-চিফ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় কমান্ডার হিসেবে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক। এঁরা সবাই ছিলেন তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের নেতা। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তারা নেতৃত্ব দেন এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এই নেতৃত্বই মুজিব বাহিনী গঠন ও সংগঠিত করার কাজ করে।

মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণ, সেনাসংখ্যা ও গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে আবির্ভাব:

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেরাদুনের পাহাড়ি অঞ্চলে এই বাহিনীর প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। প্রশিক্ষিত সেনার সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০ জন। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এই প্রশিক্ষণ ছিল শুধু অস্ত্রচালনার জন্য নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা কৌশল ও তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্যও তারা প্রস্তুত হন।
মুজিব বাহিনী তুলনামূলকভাবে উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। ভারত সরকার তাদের একটি সি-৪, একটি এন-১২ ও একটি পুরনো ডাকোটা বিমান সরবরাহ করেছিল। এছাড়া ট্রাক ও জিপের ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়।
যার মাধ্যমে মুজিব বাহিনী রণাঙ্গনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে লড়াই করে। তাদের বিশেষ সক্ষমতা ছিল গেরিলা যুদ্ধে।

মুজিব বাহিনীর ভূমিকা:

১. গেরিলা অপারেশন (আগস্ট-নভেম্বর ১৯৭১)

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যভাগে আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মুজিব বাহিনী সীমান্তবর্তী এলাকা ও ভেতরের জেলায় তৎপর ছিল। তারা পাকিস্তানি ফোর্সের ক্যাম্প ও সরবরাহ লাইনে একাধিক হামলা চালায়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট অঞ্চলে তাদের সাফল্য ভারতীয় ও বাংলাদেশি সামরিক আর্কাইভে নথিভুক্ত রয়েছে।

২. অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)

যুদ্ধ শেষ পর্যায়ে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান হোটেল শেরাটন) পাকিস্তানি অফিসার ও তাদের সহযোগীরা অবস্থান করছিল। মুজিব বাহিনীর একদল যোদ্ধা ঢাকার অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে এই হোটেলে হামলা চালায়। এই অপারেশন পাকিস্তানি কমান্ডের মনোবল ভেঙে দেয় এবং এতেই তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

৩. রসদ সরবরাহ পঙ্গু করা

যুদ্ধের শেষ সপ্তাহগুলোয় মুজিব বাহিনী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা অঞ্চলে পাকিস্তানি রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়। তাদের হামলায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনকারী কনভয় থমকে যায়, খাবার ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

৪. গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ

মুজিব বাহিনীর সদস্যরা তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান, মুভমেন্ট ও প্ল্যান সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর হাইকমান্ডকে সরবরাহ করত। এই গোয়েন্দা তথ্যই পরে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর উভয়ের জন্য যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করে।

মুজিব বাহিনীকে নিয়ে অপপ্রচার ও তথ্যের সত্যতা :

অপপ্রচার ১: মুজিব বাহিনী ‘র’-এর গেরিলা দল

দালিলিক সত্য:
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্ত বাহিনীই যোগাযোগ রেখেছিল—মুক্তিবাহিনী, নিয়মিত বাহিনী, সেক্টর কমান্ডাররা সবাই। কারণ ১৯৭১ সালে ভারতই ছিল বাংলাদেশের অস্ত্র-গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণের প্রধান উৎস। কেবল মুজিব বাহিনী নয়, বরং বেশির ভাগ গেরিলা বাহিনীই ভারতীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেয়েছিল। তাই এই তথ্যকে ‘মুজিব বাহিনী ভিন্ন’ বা ‘র’-এর কুশপুত্তলি’ প্রমাণ করার চেষ্টা ধোঁকাবাজি ছাড়া কিছু নয়।

অপপ্রচার ২: মুজিব বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, প্রশিক্ষণে গড়িমসি করে রণাঙ্গণে যায়নি

দালিলিক সত্য:
এই অপপ্রচারে কোন নাম, কোনো তারিখ, কোনো রণক্ষেত্র বা কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। কাউকে নাম ধরে বলেনি তাদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। এটা ইতিহাসের পদ্ধতি নয়।

বিপরীতে, মেজর জেনারেল সুজন সিং উবানের স্মৃতিকথা, প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিবরণ, তৎকালীন ভারতীয় আর্কাইভ ও বাংলাদেশ সামরিক ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে মুজিব বাহিনীর ভূমিকার বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের সম্মুখযুদ্ধ ও গেরিলা অপারেশনের ঘটনা দালিলিকভাবে সংরক্ষিত আছে।

একজন মুজিব বাহিনীর কমান্ডারের ডায়েরি থেকে উদ্ধৃতি: “আমরা হারুনের মিয়াঁ হোটেলে আক্রমণ চালিয়ে ৭ পাকিস্তানি সেনা মেরেছি, পাল্টায় আমাদের দুই যোদ্ধা শহীদ হন।” রণাঙ্গনে যায়নি এমন অভিযোগের সামনে এই ঘটনা কীভাবে দাঁড়ায়?

নাহিদ ইসলাম ও স্বাধীনতাবিরোধী মিথ্যাচার:

নাহিদ ইসলাম সংসদে দাঁড়িয়ে দাবি করেছেন: “মুজিব বাহিনী পাকিস্তানের এজেন্ট ছিল, তারা স্বাধীনতা চায়নি।”

একজন সংসদ সদস্য সংসদের মর্যাদাপূর্ণ আসন থেকে এসব কথা বলছেন—এটা দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক।

প্রশ্ন নং ১: যদি মুজিব বাহিনী পাকিস্তানের এজেন্ট হতো, তাহলে কেন তারা পাকিস্তানি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাবে? কেন তাদের হাতে ধরা পাকিস্তানি অস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে?

প্রশ্ন নং ২: কেন মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছেন— “বিএলএফ ছিল সবচেয়ে সাহসী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী”? কেন তিনি পাকিস্তানের এজেন্ট বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবেন?

প্রশ্ন নং ৩: যদি মুজিব বাহিনী স্বাধীনতা নাই চাইতো, তাহলে তাদের হাজার হাজার সদস্য কেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করে শহীদ হয়েছেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়েই অকথ্য বলা সহজ। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী লবির কণ্ঠস্বর’ বলাই যায়। ১৯৭১ সালে পরাজিত শক্তি ও তাদের উত্তরসূরিরা আজ কোনো না কোনো ছদ্মবেশে ইতিহাস বিকৃত করছে—নাহিদ ইসলাম হয়তো তাদেরই পথ অনুসরণ করছেন।

শেষ কথা:

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির আত্মপরিচয়ের অহংকার। এই যুদ্ধের ইতিহাসকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে চাওয়া শক্তি যত কৌশলই ব্যবহার করুক না কেন, সত্য কোনো দিন মিথ্যার কাছে হার মানে না।

মুজিব বাহিনী ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক অনিবার্য, বীরোচিত ও প্রয়োজনীয় বাহিনী। তাদের প্রশিক্ষণ, সম্মুখযুদ্ধ ও গেরিলা অপারেশন—সব মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আজ যারা সেই বাহিনীকে ‘পাকিস্তানের এজেন্ট’ আখ্যা দেয়, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপমান করে এবং সেই অপমান দেশের ৩০ লক্ষ শহীদের প্রতি পবিত্র রক্তের অপমান।

ড. মুনতাসীর মামুনের ভাষায়: “যে জাতি নিজের ইতিহাস বিকৃত করে, সে জাতি আবার পরাজয় বরণ করে।”

আমরা সেই জাতি নই যারা পরাজয় বরণ করবে। আমরা সেই জাতি যারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি— ইতিহাসের বিকৃতি মেনে নেবার জন্য নয় ।


More News Of This Category