ব্যতিক্রমী এক নেতা
ড. শেখ আকরাম আলী
একজন নেতা তাঁর মিশন বা লক্ষ্য অর্জনে সফল হওয়ার জন্য জনগণকে পরিচালিত করেন। নেতৃত্বকে একটি শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং নেতাভেদে এটি ভিন্ন হতে পারে, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য সবসময় একই থাকে। কেউ জন্মগতভাবে নেতা হন, আবার কেউ অর্জিত যোগ্যতাবলে নেতা হয়ে ওঠেন। ‘আল্লাহর তরবারি’ খ্যাত খালিদ বিন ওয়ালিদ জন্মগতভাবেই নেতা ছিলেন, অন্যদিকে ইতিহাসের সম্রাট বাবর ছিলেন একজন স্ব-নির্মিত বা স্ব-অর্জিত নেতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং জিয়াউর রহমান উভয়েই অর্জিত নেতৃত্বের উদাহরণ; তবে একজন ছিলেন নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা নেতা, আর অন্যজন তৈরি হয়েছিলেন নেতৃত্বের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। শেখ মুজিব এবং ভাসানী—উভয়েই ছিলেন জন্মগত নেতা। আবার বেগম খালেদা জিয়াও জন্মগত নেতৃত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নেতা জন্মগতভাবেই হোন কিংবা অর্জিতভাবেই হোন, তাঁরা মূলত সেই মনোনীত ব্যক্তিত্ব, যাঁরা তাঁদের কর্মের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করার জন্য নির্ধারিত থাকেন। প্রকৃত নেতারা মুখে নয়, কাজে বিশ্বাস করেন। তাঁরা তাঁদের জনগণের সাফল্য অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন এবং ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন।
নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতা নয়, এটি একটি দায়িত্ব; এবং এর জন্য প্রয়োজন সাহস, প্রজ্ঞা ও ত্যাগ। সর্বোপরি, নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সততা ও নৈতিকতা। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, যিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির একজন বিশিষ্ট ও মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের বহু ধাপে নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন এবং সামরিক ও রাজনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই একজন সফল নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ জিয়াউর রহমানকে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব প্রদর্শনের সুযোগ করে দেয় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাঁকে বীরত্বসূচক খেতাবে ভূষিত করা হয়।
এর ঠিক ছয় বছর পর, ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ, যখন পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র জনগণ চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি, তখন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে একজন অন্যতম প্রধান দিকনির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন।
১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডে নিয়ে আসে, কিন্তু শীঘ্রই তাঁর জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে একই বছরের ৭ই নভেম্বর তাঁকে আবার সেই পদে ফিরিয়ে আনে, যা তিনি চার দিন আগে (৩ই নভেম্বর) হারিয়েছিলেন। এরপর তিনি বাংলাদেশের একজন মহান নেতা হিসেবে ইতিহাসে নিজ স্বাক্ষর রাখার জন্য নির্ধারিত হন।
সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে জিয়াউর রহমান নিঃসন্দেহে ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী নেতা। প্রথমত, একটি আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্দেশ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও সৎ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত একটি আধুনিক দেশ হিসেবে দেখা ছাড়া তাঁর অন্য কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না।
বেগম খালেদা জিয়া একজন জন্মগত নেত্রী। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও নিজের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি সফল নেতৃত্ব এবং জাতীয় স্বার্থে আপসহীন মনোভাবের এক উজ্জ্বল ইতিহাস রেখে গেছেন। এর জন্য তাঁকে কেবল রাজনীতি থেকেই দূরে রাখা হয়নি, বরং কারাবাস ও উপযুক্ত চিকিৎসা ছাড়া জীবনযাপনসহ অকথ্য নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি দেশ ছেড়ে যাননি; বরং রেখে গেছেন সাহস, প্রজ্ঞা ও অবিসংবাদিত দেশপ্রেমের ইতিহাস। তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভোমত্বের প্রতীকে পরিণত হন। প্রকৃতপক্ষে, তিনিও নিজেকে একজন ব্যতিক্রমী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া—উভয়েই তাঁদের কর্মের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন। নেতা হিসেবে তাঁদের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে তাঁদের নীতি ছিল অভিন্ন। একজন জীবন উৎসর্গ করেছেন, আর অন্যজনকে সহ্য করতে হয়েছে শেখ হাসিনার মতো ইতিহাসের এক ফ্যাসিবাদী ও চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ শাসকের কঠোর নির্যাতন।
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও পেশাদার সৈনিক, যিনি তাঁর দেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন এবং দেশের জন্য নিজের জীবন দিয়েছেন। অন্যদিকে, বেগম খালেদা জিয়া রেখে গেছেন সংগ্রামময় জীবন এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের চেতনা। তিনি নিজেকে দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের এক প্রতীকে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন।
এখন বাংলাদেশের নতুন নেতার দিকে নজর দেওয়া যাক, যিনি ইতোমধ্যে তাঁর সরকারের মাধ্যমে জনগণের মনে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছেন। তাঁকেও একজন ব্যতিক্রমী নেতা বলে মনে হচ্ছে এবং তিনি তাঁর পিতা—বাংলাদেশের সেই মহান নেতার পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যেই তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, তিনি তাঁর লক্ষ্যের প্রতি আন্তরিক এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিরোধী দলের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চান।
এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো লক্ষণ যে, জাতি হয়তো একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা পেতে যাচ্ছে, যার জন্য ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে দেশের মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
তাঁর দূরদর্শী কূটনৈতিক পদক্ষেপ দেশের জন্য এবং একই সাথে তাঁর সরকারের জন্য বৈদেশিক সম্পর্কে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। এটি প্রতিবেশীদের প্রতি তাঁর সরকারের অবস্থানও পরিষ্কার করেছে। এ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত পরিপক্কতা ও প্রজ্ঞার সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের জন্য ‘পাকিস্তান মডেল’ একটি ভালো পছন্দ হতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও এর উন্নয়নের বিষয়ে তাঁর আন্তরিকতা ও গাম্ভীর্যকে নির্দেশ করে। দেশের প্রতিরক্ষায় বাজেট বরাদ্দ তাঁর সরকারের আন্তরিকতার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ‘সেকেন্ড ব্যাটালিয়ন’ গঠন বাংলাদেশের জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
একটি সরকারের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঠিক নির্বাচনের ওপর—যাঁদের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আন্তরিক, সৎ এবং যথেষ্ট দক্ষ হওয়া উচিত। দেশের মানুষ গভীর আগ্রহের সাথে মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে, তবে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ দেওয়ার সময় আসেনি। মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুলনা অঞ্চলের মতো কিছু এলাকা বাদ পড়েছে। যে কোনো স্থানে, যে কোনো রূপে এবং যে কোনো মাত্রার বৈষম্যকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।
হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজামের মতো আরও কিছু নেতা রয়েছেন, যাঁরা অন্যান্যদের চেয়ে আলাদা হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন এবং তিনি ইতোমধ্যে নিজেকে একজন ব্যতিক্রমী নেতা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তিনি যথেষ্ট সৎ, আন্তরিক এবং সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে নির্ভীক বলে মনে হয়; এবং তিনি প্রকাশ্যে জুলাইয়ের চেতনার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, তাঁর বর্তমান অবস্থান ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবেরই সরাসরি ফলাফল। বিএনপির আরও অনেক নেতার মধ্য থেকে তিনি নিজেকে অনন্য হিসেবে আলাদা করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি জাতীয় সংসদ এবং সংসদের বাইরে—উভয় জায়গাতেই জুলাইয়ের চেতনার পক্ষে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এবং আওয়াজ তুলছেন। জনগণের সেবা করার জন্য এবং বর্তমান সরকারকে সফল করে তোলার জন্য তাঁর মতো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করা উচিত।
মোহাম্মদ আলী আসগার লবী হলেন অপর একজন রাজনৈতিক নেতা, যিনি বিগত স্বৈরাচারী সরকারের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল যে, তিনি জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্যদের নিকটবর্তী ছিলেন; যার ফলে ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে তিনি তাঁর সম্পূর্ণ জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসা হারিয়েছিলেন। কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কেবল নিজের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল। বাংলাদেশের আরও অনেক রাজনৈতিক নেতার চেয়ে তিনি অনেকটাই আলাদা এবং তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের কল্যাণে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। একজন নেতা হিসেবে তিনি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
দেশের অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক নেতার বিপরীতে তিনি তাঁর নম্র ও ভদ্র আচরণের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি নিঃসন্দেহে একজন ব্যতিক্রমী নেতা এবং দেশের একজন বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি আরও বড় দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্য। তিনি যে এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন, সেটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত অঞ্চলগুলোর একটি; তাই বর্তমান সরকারের সেখানে বিশেষ নজর ও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান নেতৃত্বে সততা ও আন্তরিকতা অত্যন্ত বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই যাঁদেরকে ব্যতিক্রমী নেতা হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদেরকে জনগণের জন্য কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। যদিও এটি একটি কঠিন কাজ বলে মনে হতে পারে, তবে জিয়াউর রহমান অতীতে যেভাবে দক্ষতার সাথে করেছিলেন, বর্তমান সরকারকেও সেভাবে সতর্কতার সাথে এটি করতে হবে। বাংলাদেশে সুশাসনের জন্য জিয়াউর রহমান আজও একটি আদর্শ বা মডেল হিসেবে বিবেচিত হন।
লেখক: আইনের অধ্যাপক)
০৯ জুলাই ২০২৬