গোবিন্দগঞ্জসহ গাইবান্ধায় ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ।
কৃষকের অজান্তে ভুয়া ভাউচারে কোটি টাকা উত্তোলনের দাবি।
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জসহ জেলার কয়েকটি সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ধান না কিনেই কাগজপত্রে ধান সংগ্রহ দেখানো, কৃষকের অজান্তে তাঁদের নামে ডিও ও ভাউচার তৈরি এবং পরবর্তীতে ওই ধান মিল-চাতালে ভাঙানোর জন্য সরবরাহ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
অভিযোগ অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা পারভেজ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের নামে ধান সরবরাহের কাগজপত্র তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কৃষকদের অনেকেই জানেন না যে তাঁদের নামে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে গুদামে ধান জমা না দিয়েই কাগজে ধান সংগ্রহ দেখানো হচ্ছে। পরে একই ধান বিভিন্ন মিল-চাতালে ক্রাশিং বা ভাঙানোর জন্য সরবরাহ করা হয়েছে—এমন তথ্য নথিপত্রে দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত ধান সংগ্রহের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে বলা হচ্ছে, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধা জেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৯ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। কিন্তু এর বিপরীতে ১৪ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ধান সংগ্রহ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ধান সংগ্রহ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, অতিরিক্ত এই ধান সংগ্রহের জন্য সরকারি কোনো লিখিত আদেশ, বরাদ্দ বা অর্থ ছাড়ের অনুমোদন ছিল কি না। তাঁদের দাবি, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহের সময়সীমা থাকলেও এর আগেই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ধান সংগ্রহ দেখানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত ধান সংগ্রহ দেখানোর কারণে গাইবান্ধার বিভিন্ন খাদ্য গুদামে ধান কেনা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকের অজান্তে ধান বিক্রির কাগজ!
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কৃষকদের পরিচয় ব্যবহার করে ধান সংগ্রহ দেখানোর বিষয়ে। কয়েকজন মিল-চাতাল ব্যবসায়ীর অভিযোগ, অনেক কৃষক বাস্তবে গুদামে কোনো ধান দেননি। অথচ তাঁদের নামে ধান সরবরাহের ডিও, ভাউচার ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি হয়েছে।
এভাবে ধান না কিনেই সরকারি ক্রয় দেখানো হলে সেটি সরকারি অর্থ আত্মসাতের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত কৃষকদের বক্তব্য, ব্যাংক হিসাব, গুদামের স্টক রেজিস্টার, ডিও, ভাউচার এবং মিল-চাতালে ধান সরবরাহের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
১৮ কোটির বেশি টাকার প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ধানের আর্থিক মূল্য ১৮ কোটির বেশি টাকা হতে পারে। তাঁদের প্রশ্ন—সরকারি অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের স্পষ্ট নথি ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ ধান সংগ্রহ দেখিয়ে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা কীভাবে করা হলো?
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা, খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কিছু মিল-চাতাল মালিক এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি তদন্তের মাধ্যমে এখনো প্রমাণিত হয়নি।
অনিয়ম আড়াল করতে প্রচারণার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি আড়াল করতে বিভিন্নভাবে সংবাদ প্রচার ও জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ জন্য সাংবাদিকদের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
তদন্তের দাবি
এদিকে, গোবিন্দগঞ্জসহ জেলার খাদ্য গুদামগুলোতে ধান সংগ্রহের প্রকৃত চিত্র জানতে জরুরি ভিত্তিতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাঁদের দাবি, তদন্তে প্রতিটি কৃষকের নামে দেখানো ধান বাস্তবে গুদামে জমা হয়েছে কি না, ব্যাংক হিসাবে টাকা গেছে কি না, গুদামের স্টক ওজনের সঙ্গে কাগজপত্রের মিল রয়েছে কি না এবং কোন কোন মিল-চাতালে কত ধান সরবরাহ দেখানো হয়েছে—এসব যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ হোসেন, গাইবান্ধা সদরসহ সংশ্লিষ্ট খাদ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া এবং তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও নেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।