একই পরিবারের চারজন খুন
পুলিশের বয়ানকে ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে প্রতিবাদ করছেন রংপুরবাসী।
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
রংপুর নগরীর দাসপাড়ায় একই পরিবারের চারজন খুনের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বয়ানকে ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে প্রতিবাদে নেমেছে রংপুরের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে জাহাজ কোম্পানী মোড় এলাকায় প্রেসক্লাবের সামনে দুই ঘন্টাব্যাপি মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা জানান, চার খুনের ঘটনায় গ্রেফতার দুই যুবকের বরাদ দিয়ে পুলিশ যে বয়ান তৈরি করেছে তা কোনভাবেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। রহস্যজনক কারনে পুলিশ সত্য উদঘাটন না করে প্রকৃত তথ্যকে আড়ালে রাখার চেষ্টায় সাজানো বয়ান তৈরি করেছে। এতে প্রকৃত ঘটনা ও জড়িতরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এতে নিহতের স্বজনরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন। পুলিশ এ খুনের ঘটনায় প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও সকল অপরাধী গ্রেফতার না করা পযর্ন্ত রংপুরের মানুষ আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান জানান, চার খুনের ঘটনায় পুলিশের বয়ান ‘সাজানো নাটক’। পুলিশ প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধীদের আড়াল করতে চাচ্ছে। ‘প্রকৃত ঘটনা উম্মোচন ও অপরাধীদের গ্রেফতার না করা পযর্ন্ত পুলিশের দেওয়া বয়ানকে আমরা ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করে যাবো,’ তিনি বলেন।
তিনি হুশিয়ারী দিয়ে বলেন, ‘সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের সবাইকে খুনের ঘটনায় প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে অপরাদীদের গ্রেফতার করা না হলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবো। রংপুরে একবার আন্দোলন গড়ে উঠলে তা আর কেউ থামাতে পারবে না।’
রংপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু জানান, ‘পুলিশ প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে কাকে বাঁচাতে চাচ্ছে এটা আমাদের কাছে পরিস্কার করতে হবে। দুই জন যুবকের পক্ষে একই পরিবারের চারজনকে শ্বাসরোধ হত্যা করা মোটেই সম্ভব নয়। এ খুনের আড়ালে রয়েছে রহস্য। এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। এ হত্যাকান্ডের সাথে সংঘবদ্থ চক্র জড়িত রয়েছে।’
তিনি জানান, ‘বাড়ীর ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া একেএকে পরিবারের চারজনের সবাইকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে পুলিশের এমন বয়ানকে আমরা মেনে নিতে পারছি না। পুলিশ এ ধরনের মনগড়া বয়ান দিয়ে এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় রহস্য তৈরি করেছে। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া দরকার।’
রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী আবির হোসেন জানায়,’ গণপতি স্যার ও তার পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। স্যারের পরিবারের সবাইকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। এ খুনের ঘটনায় আমাদেরকে বিচার চাইতে হবে। আমরাই স্যারের সন্তান। আমরাই আন্দোলন গড়ে তুলবো।’
সে জানায়,’ পুলিশের দেওয়া বয়ানকে আমরা বিশ্বাস করি না। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় বড় রহস্য রয়েছে। পুলিশকে এ সত্য উদঘাটন করতে হবে এবং আমাদেরকে জানাতে হবে। সকল অপরাধীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার্স ইনচার্জ জিন্নাত আলী জানান, গ্রেফতার দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের বন্ধু সীমান্ত দাস স্বাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে রংপুর মুখ্য মহানগর হাকিম আদলতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
’ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সীমান্তের বাড়িতে সিদ্ধার্থ. মুগ্ধ ও সীমান্ত একসাথে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। সীমান্তের দেওয়া কিছু তথ্য আমরা খতিয়ে দেখিছি,’ তিনি বলেন।
জিন্নাত আলী বলেন,’ গ্রেফতার দুই যুবকের মাদক সেবনের তথ্য নিশ্চিত করতে ডোপ টেস্ট করার ডকেট পেয়েছি। দ্রুত তাদের ডোপ টেস্ট করা হবে।’
সীমান্ত দাস নিহত গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশি সুভাষ চন্দ্র দাসের ছেলে।
তবে বুধবার দুপুরে দাসপাড়ায় গিয়ে সীমান্ত দাসের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার বাবা সুভাষ চন্দ্র দাসকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোন কথাই বলতে রাজি হননি।
মামলার বাদী ও নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপিনাথ চক্রবর্তীর অভিযোগ, এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় কতটুকু অগ্রগতি হচ্ছে পুলিশ কোন তথ্যই তাদেরকে জানাচ্ছে না। ‘শুধু আমরা কেন, রংপুরবাসী এমনকি সারাদেশের কোন মানুষই পুলিশের দেওয়া বয়ানকে মেনে পারছে না। এতবড় হত্যিাকান্ড শুধু দুইজন যুবকের পক্ষে ঘটানো সম্ভব নয়। এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। বাস্তবতার সকল তথ্যই বলছে এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আকস্মিক ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারনে এ হত্যাকান্ড ঘটেছে এমন তথ্য মনগড়া ও সাজানো মাত্র,’ তিনি বলেন।
তিনি বলেন,’ আমাদের গ্রাম মিঠাপুবুর উপজেলার মির্জাপুরে কোন সম্পত্তি নেই। আমার শুধু ৭ শতাংশের বসতভিটা আছে। আমি গ্রামে পুরোহিতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার ভাইয়ের সাথে কারো কোনদিন দ্বন্দ হয়নি।’
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার ও গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান সনাতদন চত্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, ‘গ্রেফতার দুই যুবকের দেওয়া স্বীকারোক্তি থেকে নিশ্চিত হয়েছি তারা দুজনই এ হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে। আপাতত অন্য কাউকে সন্দেহ করার তেমন তথ্য নেই। তবে মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।’
তিনি জানান,’ যদি কোন ব্যক্তি পুলিশের দেওয়া বয়ানকে ‘সাজানো নাটক’ মনে করেন তাহলে তিনি আমার কাছে আসলে তাকে ঘটনাটি বুঝিয়ে বলবো।’
গেল শনিবার রাত ১১টা দিকে রংপুর নগরীর দাসপাড়[ (মাছুয়াপাড়া) এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে শুক্রবার ভোরে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত শেষে রাতে রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে দাহ্য করা হয়।