সংস্কারকাজ পরিদর্শনে সংসদ সদস্য, প্রশংসায় ভাসছে ব্যতিক্রমী সামাজিক উদ্যোগ
মো. মেহেদী হাসান, স্টাফ রিপোর্টারঃ
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মরহুম আজিতউল্লাহ গার্ডের পরিবার। সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সম্পূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শিক্ষা-অনুরাগ থেকে পরিবারটির অর্থায়নে শুরু হয়েছে বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন সংস্কারের কাজ। প্রায় অর্ধকোটি টাকার এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে এলাকাবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যক্তি উদ্যোগের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৪০ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবদান রেখে চলেছেন। তবে সময়ের ব্যবধানে বিদ্যালয়ের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, দেয়ালের পলেস্তারা খসে যাওয়া এবং জানালা-দরজার নষ্ট হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি পরিদর্শনে ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ও পাঠদানের অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হলেও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এমন পরিস্থিতিতে মরহুম আজিতউল্লাহ গার্ডের পরিবার বিদ্যালয়টির ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। পরিবারের অর্থায়নে শুরু হওয়া সংস্কার প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। শুধু ভবন সংস্কারই নয়, মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থাও চালু করেছে পরিবারটি। ফলে শিক্ষা ও মানবিক কল্যাণে তাদের অবদান নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র (ব্যাচ-১৯৬০) মো. জলিলুর রহমান বলেন, “মরহুম আজিতউল্লাহ গার্ড সাহেবের পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতায় আমরা এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষের এগিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। আমরা আশা করি অন্যরাও এই মহৎ উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হবেন।”
সহ-প্রকল্প সমন্বয়ক, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র (ব্যাচ-১৯৮৬) ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. শামসুল আজাদ শীতল বলেন, “ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয় আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগের অংশ। গার্ড পরিবারের এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম মণ্ডল বলেন, “বিদ্যালয়ের সংস্কারে গার্ড পরিবারের অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সংস্কারকাজ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীরা আরও সুন্দর, নিরাপদ ও আধুনিক পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে, যা শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
সংস্কারকাজের অগ্রগতি দেখতে গতকাল সাঘাটা-ফুলছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল ওয়ারেছ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি মরহুম আজিতউল্লাহ গার্ডের পরিবারের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “ঐতিহ্যবাহী ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়নে গার্ড পরিবারের অবদান সত্যিই অনুকরণীয়। সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে এভাবে এগিয়ে আসেন, তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ হবে। সরকারি পর্যায় থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক মো. জলিলুর রহমান, সহ-সমন্বয়ক শামসুল আজাদ শীতল, প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম মণ্ডল, সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল্লাহ আকন্দ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। এ সময় সংসদ সদস্য বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সংস্কার ও উন্নয়নকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি পর্যায়ে আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী পুরোনো ভবন সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজও চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মকবুলার রহমান মণ্ডল ছিলেন এলাকার একজন বিশিষ্ট সমাজসেবক ও জননেতা। তার প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর সেই ঐতিহ্য রক্ষায় মরহুম আজিতউল্লাহ গার্ডের পরিবারের এই মহৎ উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে।
শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলের মতে, ব্যক্তি উদ্যোগে একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় গার্ড পরিবারের এই অবদান ভবিষ্যতে সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে। সংস্কারকাজ সম্পন্ন হলে ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয় আবারও এ অঞ্চলের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।