সাংবাদিকদের শত্রু সাংবাদিকরাই!
এ আর আল মামুন ঃ স্টাফ রিপোর্টার
সাংবাদিকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসংগতির চিত্র তুলে ধরে সত্য প্রকাশ করাই একজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, কখনো কখনো সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ান তাঁদেরই সহকর্মীরা। ফলে প্রশ্ন ওঠে—সাংবাদিকদের শত্রু কি সত্যিই সাংবাদিকরাই?
সাংবাদিকতার জগতে এমন কিছু বাস্তব চিত্র দেখা যায়, যা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তোলে। একজন সাংবাদিক কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করলে অন্য কোনো সাংবাদিক ব্যক্তিগত স্বার্থে সেই সংবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন। আবার কেউ ভালো কাজের স্বীকৃতি পেলে সহকর্মীর একাংশের মধ্যে ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা কিংবা বিরূপ মনোভাব দেখা যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো সাংবাদিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি সংবাদটি খণ্ডন করার পরিবর্তে কিছু সাংবাদিককে ব্যবহার করে ওই সংবাদদাতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করলেন। আবার কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হামলা, মামলা কিংবা হয়রানির ঘটনা ঘটলে পেশাগত ঐক্য গড়ে তোলার পরিবর্তে কেউ কেউ নীরব থাকেন, এমনকি ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতেও অনীহা প্রকাশ করেন।
কখনো দেখা যায়, সাংবাদিকদের মধ্যে পদ-পদবি, সংগঠনের নেতৃত্ব, সংবাদ প্রকাশের সুযোগ কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একজনের সাফল্য অন্যজনের অনুপ্রেরণা হওয়ার পরিবর্তে প্রতিযোগিতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া অভিযোগ ছড়ানো, ব্যক্তিগত বিরোধকে পেশাগত বিরোধে রূপ দেওয়া এবং একে অপরকে ছোট করার প্রবণতাও সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।
তবে সব সাংবাদিককে একইভাবে বিচার করা অন্যায়। সাংবাদিকদের মধ্যে যেমন স্বার্থান্বেষী ও অসহযোগিতামূলক আচরণ থাকতে পারে, তেমনি অসংখ্য সাংবাদিক সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। সহকর্মীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, নির্যাতনের প্রতিবাদ করা এবং পেশাগত অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, একজন সাংবাদিক যখন অন্যায়ের শিকার হন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কার? একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ তদন্ত ও ন্যায্য প্রক্রিয়ায় সমাধান হওয়া উচিত। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশ, প্রতিহিংসা কিংবা পেশাগত ঈর্ষা থেকে কাউকে হেয় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সত্য প্রকাশের প্রশ্নে তাঁদের নৈতিক অবস্থান হওয়া উচিত দৃঢ়। সাংবাদিকের কলম যেন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অস্ত্র না হয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হয়।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র নয়। এটি মানুষের অধিকার, সমাজের কল্যাণ এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব। তাই সহকর্মীর সাফল্যে ঈর্ষা নয়, সহযোগিতা; বিপদে নীরবতা নয়, ন্যায়সংগত প্রতিবাদ; আর মতপার্থক্যে শত্রুতা নয়, পেশাগত সৌজন্য বজায় রাখা জরুরি।
শেষ কথা—সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁদের কলম, আর সেই শক্তির ভিত্তি হলো সততা, সাহস ও ঐক্য। সাংবাদিকেরা যদি নিজেরাই নিজেদের দুর্বল করে দেন, তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের সম্মিলিত কণ্ঠও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই সময় এসেছে আত্মসমালোচনার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করার এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।
সাংবাদিকের প্রতিপক্ষ হওয়া উচিত অন্যায়, দুর্নীতি ও অসত্য—নিজের সহকর্মী নয়।