একই মায়ের তিন সন্তানই প্রতিবন্ধী, অভাবের সংসারে প্রতিদিনের লড়াই মা হাসিনা বেগমের
তিন সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অসহায় মায়ের চোখের জলে ফুটে ওঠে মাতৃত্বের অনন্য গল্প
মোঃ রুহুল আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে :
এক মায়ের তিন সন্তান। তিনজনই প্রতিবন্ধী। সংসারে অভাব, অনিশ্চয়তা আর নিত্যদিনের টানাপোড়েন। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, চিকিৎসার খরচ জোগানো আর বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে দিন পার করা—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই যেন এক কঠিন পরীক্ষা। তবু সন্তানদের প্রতি নেই কোনো অভিযোগ, নেই ভাগ্যের কাছে হার মেনে নেওয়ার আর্তনাদ। আছে শুধু বেঁচে থাকার তাগিদ, সন্তানদের বুকে আগলে রাখার আকুলতা আর একজন মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের রাগৈ গ্রামের শিমুলিয়া আদর্শ গ্রামের (গুচ্ছগ্রাম) বাসিন্দা হাসিনা বেগমের জীবনের গল্পটি এমনই। তিন প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম যেন অভাবের কাছে হার না মানা এক মায়ের নীরব যুদ্ধ।
সম্প্রতি শাহরাস্তি উপজেলার একটি এলাকায় সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়ে দেখা হয় হাসিনা বেগমের সঙ্গে। কে বা কারা তাঁকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে চলে যান, তা জানি না। হঠাৎ অসহায় এই নারী ও তাঁর কোলের শিশুটিকে দেখে মনটা ভারী হয়ে উঠল। শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে আর মায়ের চোখের পানি দেখে নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম—এই মুহূর্তে আমি তাঁর জন্য কী করতে পারি?
কথা বলতে বলতে হাসিনা বেগম চোখ মুছছিলেন। কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, চোখে ছিল অনিশ্চয়তা। তিনি বললেন, তাঁর তিনটি সন্তানই প্রতিবন্ধী। কোলে থাকা শিশুটি তাঁর ছোট সন্তান। বড় দুজনকে বাড়িতে রেখে তিনি মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে বের হয়েছেন।
কী বলব, কীভাবে সান্ত্বনা দেব—বুঝে উঠতে পারছিলাম না। প্রায় ১২-১৩ মিনিট ধরে কথা বলেও তাৎক্ষণিকভাবে কীভাবে তাঁকে সহায়তা করা যায়, ঠিক করতে পারছিলাম না।
ঠিক সেই সময় দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া এক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি রামগঞ্জ থেকে ফিরছিলেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাড়ি যাওয়ার পথে আমাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে আসেন। তাঁর সঙ্গে এই পরিবারের পরিচয় রয়েছে। কিছুটা স্বস্তি পেলাম। ভাবলাম, তাঁর পরামর্শ নিয়ে অসহায় মায়ের হাতে সামান্য কিছু টাকা তুলে দেওয়া যাবে।
সহকর্মীকে বললাম, ‘তাহলে কি আপনিই তাঁকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন?’
তিনি জানালেন, আমি সেখানে আছি, তা তিনি জানতেন না। প্রথমে দূর থেকে চিনতে পারেননি। পরে আমাকে দেখে নিশ্চিত হয়ে সিএনজি থামিয়ে নেমে এসেছেন।
এরপর আবার কথা শুরু হলো হাসিনা বেগমের সঙ্গে।
জানতে চাইলাম, তাঁর স্বামী কোথায় থাকেন, কী করেন। তিনি জানালেন, স্বামী সেলিম মিয়া চট্টগ্রামে সিএনজি চালান। বাড়িতে চার-পাঁচ মাস পরপর আসেন। স্বামী টাকা পাঠান, কিন্তু সেই টাকায় তিন সন্তান, নিজের ও বৃদ্ধ শাশুড়ির সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই প্রতিদিন মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাততে হয় তাঁকে। কখনো ২০০ টাকা, কখনো ৩০০ টাকা জোটে। সেই সামান্য টাকায় সন্তানদের খাবার, সংসারের প্রয়োজন—কোনোটাই ঠিকমতো মেটে না। তাঁর ভাষায়, ‘অনেক কষ্টে চলতে হয়।’
জানতে চাইলাম, তিন সন্তানই প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাঁরা সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পান কি না।
হাসিনা বেগম জানালেন, আগে বড় দুই সন্তানের নামে তিন মাস পরপর ৬৫০ টাকা করে মোট ১ হাজার ৯৫০ টাকা ভাতা পেতেন। এবার ছোট শিশুটির নামও ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তবে এখনো তার ভাতার টাকা পাননি।
সরকারি ভাতা পাওয়ার কথা শুনে তাঁকে বলেছিলাম, তাহলে হয়তো কিছুটা কষ্ট কমার কথা। কিন্তু তাঁর উত্তরটি ছিল বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি—যে টাকা পান, তা দিয়ে সংসার চালানো যায় না। তাই বাধ্য হয়েই মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়।
এরপর জানতে চাইলাম, তিনি কীভাবে আমার কাছে এলেন? আমাকে চেনেনই বা কীভাবে?
এবার তিনি ব্যাগ থেকে একটি কাগজ বের করলেন। সেখানে আমার ছবি ও ঠিকানা লেখা। কাগজটি দেখিয়ে বললেন, চিতোষী পশ্চিম ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের আনোয়ার তাঁর ফুফাতো ভাই। আনোয়ারের চিকিৎসার জন্য একসময় তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই সূত্রে আনোয়ারের মা আমেনা বেগম আমার নাম-ঠিকানা ও ছবি তাঁকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সম্ভব হলে আমার সঙ্গে যেন দেখা করেন।
কাগজের ছবিটি দেখে মনে পড়ে গেল আমেনা বেগমের কথা। সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। জানতে চাইলাম, তিনি কেমন আছেন।
হাসিনা বেগম জানালেন, বয়স হয়েছে। আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। অসুস্থতাও রয়েছে।
মনে মনে ভাবলাম, একবার আনোয়ার ও তাঁর মাকে দেখে আসা দরকার। মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যেগুলো দীর্ঘদিন দেখা না হলেও মনের ভেতর রয়ে যায়।
এরই মধ্যে ঘড়ির কাঁটায় বিকেল সাড়ে চারটা। বিকেল পাঁচটায় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা। হাতে সময় খুব কম। বিদায়ের আগে হাসিনা বেগমের ঠিকানা লিখে নিলাম। নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও তাঁর হাতে সামান্য কিছু টাকা তুলে দিলাম।
বললাম, ‘আমি নিজেও গরিব মানুষ। আমার পক্ষে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। তবে সুযোগ হলে একদিন আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনাকে দেখে আসব।’
টাকাটা হাতে নিয়ে তিনি কী অনুভব করছিলেন, তা হয়তো পুরোপুরি বোঝার সাধ্য আমার নেই। তবে তাঁর জীবনের কষ্টের তুলনায় আমার এই সামান্য সহায়তা যে খুবই নগণ্য, তা বুঝতে পারছিলাম।
এরপর তাঁকে বিদায় জানিয়ে সিএনজিতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল। কিন্তু মন পড়ে রইল সেই মায়ের কাছে, তাঁর কোলের শিশুটির কাছে, বাড়িতে অপেক্ষায় থাকা অন্য দুই সন্তানের কাছে।
ভাবছিলাম, প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায়! পৃথিবীতে কত মানুষ একটি সন্তানের মুখ দেখার জন্য আকুল হয়ে থাকেন। আর হাসিনা বেগম—তিনটি সন্তানকে বুকে আগলে রেখে প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছেন। সন্তানদের একজনও নয়, তিনজনই প্রতিবন্ধী। তবু তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই। সন্তানদের নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগও শুনিনি। শুনেছি শুধু অভাবের কথা, সংসার চালানোর কষ্টের কথা।
মায়ের কাছে সন্তান কখনো বোঝা নয়।
সন্তান সুস্থ হোক কিংবা প্রতিবন্ধী—মায়ের কাছে সে তাঁরই সন্তান। তার মুখে একমুঠো খাবার তুলে দিতে, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে একজন মা নিজের কষ্ট, অপমান আর ক্ষুধাকেও নীরবে সহ্য করেন। হাসিনা বেগমের চোখের পানি যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রতিচ্ছবি।
তাঁর জীবন আমাদের সামনে আরেকটি প্রশ্নও রেখে যায়—প্রতিবন্ধী সন্তানদের লালন-পালন, চিকিৎসা ও পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে সরকারি সহায়তা কতটা কার্যকর হচ্ছে? প্রতিবন্ধী ভাতা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হলেও, বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। পাশাপাশি এ ধরনের পরিবারের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা দরকার।
হাসিনা বেগমের কষ্টের গল্প কেবল একজন অসহায় মায়ের ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি এমন অনেক পরিবারের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যাঁরা নীরবে প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছেন।
হয়তো আমার দেওয়া সামান্য অর্থে তাঁর সংসারের কষ্ট ঘুচবে না। হয়তো পরদিনও তাঁকে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে। কিন্তু তাঁর চোখের পানি আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে—মানুষের পাশে দাঁড়াতে সব সময় অনেক অর্থের প্রয়োজন হয় না; কখনো প্রয়োজন হয় একটু মনোযোগ, কিছুটা সহমর্মিতা এবং তাঁর কষ্টের কথা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিকতা।
আমি জানি না, কবে আবার হাসিনা বেগমের বাড়িতে যেতে পারব। তবে তাঁর মুখটি, কোলের শিশুটির নিষ্পাপ চেহারা আর বড় দুই সন্তানকে বাড়িতে রেখে সাহায্যের আশায় বেরিয়ে পড়া মায়ের কথাগুলো সহজে ভুলতে পারব না।
একজন মা প্রতিদিন সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করেন। অথচ সেই মায়ের কষ্টের খবর আমরা কতজন রাখি?
সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে যে মা প্রতিদিন মানুষের কাছে হাত পাতেন, তাঁর জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতার পাশাপাশি কার্যকর সামাজিক সহায়তা। তাঁর তিন সন্তানের জীবন যেন অভাবের অন্ধকারে হারিয়ে না যায়—এ দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, আমাদের সম্মিলিত মানবিকতারও।
মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। কিন্তু সেই মায়ের চোখের পানি মুছে দেওয়ার দায়িত্ব কি শুধু তাঁর একার?