বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ন
Headline :
সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সব পদক্ষেপ নেবে সরকার এমপি মিলন দিনাজপুরে উদ্ধার হওয়া ৩২ কেজি ওজনের প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে হস্তান্তর ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষা-২০২৬ এর প্যারেড পরীক্ষা অনুষ্ঠিত শাহরাস্তি থানা পুলিশ কর্তৃক সিআর পরোয়ানাভু্ক্ত ০১ জন আসামী গ্রেফতার। শিরোনাম:* লিজা আক্তারের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠিত গজীপুর জেলার কালীগঞ্জে মাদকবিরোধী মিনি বার ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত সাঘাটা উন্নয়ন সংস্থার ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মাদ্রাসা ও এতিমখানায় ফ্যান উপহার গাইবান্ধায় জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত রংপুরে ১৭ তরুণীর হাতে বিনামূল্যে ল্যাপটপ হস্তান্তর: চট্টগ্রামের মিরসরাইতে ১২ নং খৈইয়াছড়া ইউনিয়ন

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস,,,

Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

🇧🇩 নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস,,,
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র স্টাফ রিপোটার দৈনিক বাংলার সংবাদ সিনিয়র স্টাফ রিপোটার,,
রক্ত, প্রতিরোধ ও বিজয়ের এক গৌরবময় অধ্যায়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। হাওরবেষ্টিত এই জনপদের মানুষ শুধু যুদ্ধের সময় অপেক্ষা করেনি—যুদ্ধের প্রস্তুতি, সংগঠন, গেরিলা প্রতিরোধ, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়-সহায়তা এবং শেষ পর্যন্ত হানাদারমুক্ত করার লড়াইয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। প্রাপ্ত স্থানীয় ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, মোহনগঞ্জের ৩৩৯ জন মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

১) মোহনগঞ্জে থানা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ডা. আখলাকুল হোসাইন ছিলেন আহ্বায়ক এবং আব্দুল কদ্দুছ আজাদ সদস্যসচিব। আব্দুল মমিন, মোফাজ্জল হোসেন খান চৌধুরী ছদ্দু মিয়া, আমীর উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল ওয়াহেদ, গোলাম এরশাদুর রহমানসহ অনেকে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।

২. মোহনগঞ্জ গার্লস স্কুলে গেরিলা প্রশিক্ষণ
২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর মোহনগঞ্জেও প্রতিরোধের প্রস্তুতি আরও তীব্র হয়।
মোহনগঞ্জ গার্লস স্কুল প্রাঙ্গণে ছাত্র ও যুবকদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। স্থানীয় বাঙালি পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় থানার অস্ত্রও প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। পানুর গ্রামের মোবারক আলী খান ও আনসার কমান্ডার আব্দুল হামিদ প্রশিক্ষণে ভূমিকা রাখেন। পরে অনেক তরুণ ভারতের তুরা, দেরাদুন ও হাফলং এলাকায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এখানেই মোহনগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—যে স্কুলে একসময় ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করত, সেই প্রাঙ্গণই একসময় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতির জায়গায় পরিণত হয়েছিল।

৩.) ৩০ এপ্রিল—মোহনগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশ
১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী আকস্মিকভাবে মোহনগঞ্জে প্রবেশ করে এবং থানায় ক্যাম্প স্থাপন করে।
থানা ভবনটি শুধু সামরিক ক্যাম্প ছিল না; সেটিকে নির্যাতনকেন্দ্র ও বন্দিশিবির হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা কংস নদীর তীরে মোহনগঞ্জ শ্মশানঘাটকে বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করত। সেখানে নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হতো।

৪.) কংস ও ধনু নদীও হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের অংশ
মোহনগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছিল। নদীপথ ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনী রসদ পরিবহন করত।
মুক্তিযোদ্ধারা গাগলাজুরের কাছে ধনু নদীতে পাকিস্তানি বাহিনীর রসদবাহী একটি লঞ্চ ধ্বংস করেন। এই অভিযানে ইপিআরের সুবেদার ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল অংশ নেয়। মহব্বত আলী, মোহন খান, আহম্মদ আলী চৌধুরী হীরা, আজিজুল হক চৌধুরীসহ মুক্তিযোদ্ধারা এতে যুক্ত ছিলেন। হাওর-নদীঘেরা মোহনগঞ্জ তাই শুধু স্থলভূমিতে নয়, নদীপথেও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

৫) ১০ অক্টোবর—মোহনগঞ্জ থানায় ঐতিহাসিক আক্রমণ
মোহনগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ অক্টোবর ১৯৭১ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন।
এর আগের দিন, ৯ অক্টোবর, মোহনগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে চার পাকিস্তানি রেঞ্জার নিহত হয়। পরদিন রাত প্রায় ১২টার দিকে ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা মোহনগঞ্জ থানায় প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। প্রায় এক ঘণ্টার যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সৈন্যরা থানা ছেড়ে বারহাট্টার দিকে পালিয়ে যায়। ভোররাতে মুক্তিযোদ্ধারা মোহনগঞ্জ থানা দখল করেন।
এটি মোহনগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বড় সাফল্য।

৬). ডিসেম্বরের অবরোধ ও চূড়ান্ত বিজয়
ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা মোহনগঞ্জের পাকিস্তানি ক্যাম্পকে চারদিক থেকে চাপে ফেলতে থাকেন।
নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে পাকিস্তানি ক্যাম্পে খাদ্য ও রসদ সরবরাহ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের চাপ, খাদ্যসংকট এবং যুদ্ধের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারে—মোহনগঞ্জে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়।
৭ ডিসেম্বর রাত: পাকিস্তানি বাহিনী মোহনগঞ্জ ক্যাম্প ছেড়ে নেত্রকোনার দিকে পালিয়ে যায়।
৮ ডিসেম্বর ১৯৭১:
🇧🇩 মোহনগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়।
অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর মোহনগঞ্জের মানুষের জন্য শুধু একটি তারিখ নয়—এটি স্বাধীনতার বিজয়ের দিন।

৭.) মোহনগঞ্জের ছয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা
মোহনগঞ্জের ৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার শহীদ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন—
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা
বাড়ি
যে যুদ্ধে/অভিযানে শহীদ
১)একদিল হোসেন, বরান্তর,বিজয়পুর সীমান্ত ক্যাম্পের যুদ্ধ
২)আলী উসমান,পানুর,কলমাকান্দা যুদ্ধ
৩)নূর হোসেন, পালগাঁও,শিববাড়ি ক্যাম্পের যুদ্ধ
৪)আনোয়ার আলম খান চৌধুরী কামাল,টেঙ্গাপাড়া,ফাংগা ক্যাম্প
৫)সিপাহি নূরুল হুদা সিদ্দিক, নলজুরি,কুমিল্লায় যুদ্ধ
৬)দবির উদ্দিন,টেঙ্গাপাড়া,নেত্রকোনা সদরের যুদ্ধে

তাঁদের আত্মত্যাগ মোহনগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও গৌরবময় করেছে।

৮). মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজও বেঁচে আছে
স্বাধীনতার পর মোহনগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থানের নামকরণ করা হয়েছে। শহীদ অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমানের স্মৃতিতে মোহনগঞ্জের একটি প্রধান সড়কের নাম শহীদ এফ রহমান রোড করা হয়। শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শহীদ আলী উসমানের নামে শিশু পার্ক ও মুক্তমঞ্চও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করছে।

বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই জাতির সূর্য সন্তানদের


More News Of This Category