মারসা মাতরুহে দারুল আজহার বাংলাদেশের বর্ণাঢ্য রেহলা–২০২৬
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
মিশরের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র ও ‘মিশরের মালদ্বীপ’খ্যাত মারসা মাতরুহে বর্ণাঢ্য সমুদ্রভ্রমণের আয়োজন করেছে দারুল আজহার বাংলাদেশ, মিশর শাখা। শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ রেহলায় মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশগ্রহণ করেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টায় কায়রোর মদিনাতুল বুউস আল-ইসলামিয়া থেকে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে রেহলার যাত্রা শুরু হয়। রাতের দীর্ঘ যাত্রা শেষে ফজরের সময় অংশগ্রহণকারীরা পৌঁছান মারসা মাতরুহে। নতুন দিনের আলোয় সমুদ্রের নীল জলরাশি আর নির্মল প্রকৃতির সান্নিধ্যে শুরু হয় আনন্দঘন একটি দিন।
রেহলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল সূর্যোদয়ের সময় ইয়ট ভ্রমণ। ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নীল সমুদ্রের বুকে ইয়টে ভ্রমণ করেন অংশগ্রহণকারীরা। সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি, আকাশের রঙ বদলে যাওয়ার দৃশ্য এবং মারসা মাতরুহের উপকূলীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন তারা। ইয়ট ভ্রমণের পাশাপাশি ছবি তোলা ও পারস্পরিক আনন্দ-আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
ইয়ট ভ্রমণ শেষে সকালের নাস্তা করে রেহলাদল যায় আল-আবইয়াদ সৈকতে। সাদা বালুর বিস্তৃত সৈকত, নীল সমুদ্র আর নির্মল আকাশের মনোরম পরিবেশে অংশগ্রহণকারীরা সময় কাটান। কেউ সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, কেউ ছবি তুলে স্মৃতিকে ধরে রাখেন, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প ও আড্ডায় কাটান আনন্দঘন সময়।
দুপুরের খাবারের পর বিকেলে রেহলাদল রওনা হয় বিখ্যাত আজিবা সৈকতের উদ্দেশ্যে। পাহাড়, নীল সমুদ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয় অংশগ্রহণকারীদের মুগ্ধ করে। মারসা মাতরুহের অন্যতম আকর্ষণীয় এই স্থানটি ভ্রমণকারীদের জন্য হয়ে ওঠে দিনের অন্যতম স্মরণীয় গন্তব্য।
এরপর কেনাকাটার জন্য রেহলাদল যায় লিবিয়া মার্কেটে। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় কাটান অংশগ্রহণকারীরা। স্থানীয় বিভিন্ন পণ্য ও সামগ্রী কেনাকাটার পাশাপাশি বাজারের ব্যস্ত পরিবেশ উপভোগ করেন তারা। পরে ভার্জিনিয়া ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দিনের নির্ধারিত ভ্রমণসূচির আনুষ্ঠানিক অংশ শেষ হয়।
রেহলার সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন দারুল আজহার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাবিবুল বাশার আজহারী। তিনি দারুল আজহার পরিবারের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করে বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর কুদরত উপলব্ধি করাও একজন মুমিনের অন্যতম শিক্ষা হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “এই রেহলার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন দেখার সুযোগ পেয়েছি। আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর কুদরত দেখে যেন আমাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায় এবং আমরা আমাদের আমল ও ইবাদতের প্রতি আরও যত্নবান হতে পারি এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।”
শায়েখ হাবিবুল বাশার আজহারী আরও বলেন, ভ্রমণ শুধু বিনোদনের জন্য নয়; এর মাধ্যমে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আত্মিক শিক্ষাও অর্জন করা সম্ভব। প্রকৃতির বৈচিত্র্য মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও বিস্ময় জাগিয়ে তোলে। দারুল আজহার বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের শিক্ষামূলক ও জ্ঞানবর্ধক রেহলার আয়োজন অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।
অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রেহলা থেকে প্রত্যেকে যদি অন্তত কিছু শেখার চেষ্টা করেন এবং সেই শিক্ষাকে জীবনে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলেই এ আয়োজনের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে।
সন্ধ্যা ৭টায় মারসা মাতরুহ থেকে কায়রোর উদ্দেশ্যে ফেরার যাত্রা শুরু হয়। দিনের আলো নিভে এলেও অংশগ্রহণকারীদের মনে তখনও রয়ে যায় নীল সমুদ্র, শুভ্র সৈকত, ইয়ট ভ্রমণ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন সময়ের স্মৃতি।
পুরো রেহলায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাবার ও নাস্তার পাশাপাশি সৈকতে প্রবেশ, চেয়ার-ছাতা, টয়লেট সুবিধা ও ইয়ট ভ্রমণের ব্যবস্থা ছিল।
আয়োজকরা জানান, বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করা, মানসিক প্রশান্তি সৃষ্টি, মিশরের প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং ভ্রমণের মাধ্যমে শিক্ষা ও আত্মিক উপলব্ধির সুযোগ সৃষ্টি করাই এ ধরনের রেহলার অন্যতম উদ্দেশ্য।
ভবিষ্যতেও মিশরের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানে শিক্ষার্থী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আরও শিক্ষামূলক রেহলার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান আয়োজকরা।
দারুল আজহার বাংলাদেশ, মিশর শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত মারসা মাতরুহ রেহলা–২০২৬ তাই শুধু একটি সমুদ্রভ্রমণ নয়; বরং প্রকৃতির সৌন্দর্য, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, আনন্দ, শিক্ষা ও আত্মিক উপলব্ধির এক স্মরণীয় আয়োজন হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের মনে জায়গা করে নেয়।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর