সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন
Headline :
পাটগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় কসমেটিকস ও বাইসাইকেল আটক লালমনিরহাট জেলা সংবাদদাতা মোঃসেলিম মিয়া গোমস্তাপুরে সড়কের পাশে অটো রাইস মিল নির্মাণ, সড়কে বালু-নির্মাণসামগ্রী—দুর্ঘটনার শঙ্কা মোঃ তুহিন,চাঁপাইনবাবগঞ্জ কসমেটিক্স-বিকাশের দোকানের আড়ালে মাদক ও অনলাইন জুয়ার অভিযোগ! জুয়েলকে ঘিরে চাঞ্চল্য। তিস্তা ব্যারেজ পরিদর্শন করলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাউবো কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে অবসর গ্রহন করলেন ডা. নূরুল হক “হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের” কালিয়াকৈরে অভিযান: ১১০টি কারেন্ট ও রিং জাল জব্দ, পুড়িয়ে ধ্বংস নীলফামারীতে ৪ শিশুকে একা পেয়ে ধর্ষণচেষ্টা চেষ্টা, বৃদ্ধ গ্রেফতার। আরমান হোসেন রাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২ সিরাজগঞ্জে নাটুয়াপাড়ায় লিও পাম্প বাংলাদেশের উদ্যোগে দিনব্যাপী ফ্রি সার্ভিস ক্যাম্প সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি মধুপুরে মাদক-জুয়া ও সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে মতবিনিময় আঃ হামিদ মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডঃ বাংলাদেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ভেঙে অবৈধ ক্ষমতা দখলের রাজনীতির সূচনা করে।

Update : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডঃ বাংলাদেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ভেঙে অবৈধ ক্ষমতা দখলের রাজনীতির সূচনা করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ কেবল একটি শোকাবহ দিন নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গভীরভাবে আঘাত করা এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে যে রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার অভিঘাত আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত হয়। ইতিহাসবিদ ও গবেষক সৈয়দ বদরুল আহসান যথার্থই বলেছেন- “১৫ আগস্ট বাংলাদেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দেয় এবং অবৈধ ক্ষমতা দখলের রাজনীতির সূচনা করে।” সএই একটি বাক্যই ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে সংক্ষেপে তুলে ধরে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হতে থাকে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৫২), যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন (১৯৫৪), ছয় দফা (১৯৬৬), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন—প্রতিটি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ নেয়।

ইতিহাসবিদ রিচার্ড সিসন এবং লিও ই. রোজ তাঁদের গবেষণাগ্রন্থ War and Secession: Pakistan, India and the Creation of Bangladesh-এ লিখেছেন, “Sheikh Mujibur Rahman was the central political force around whom the Bengali nationalist movement crystallized.” অর্থাৎ বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একটি কার্যকর রাষ্ট্র নয়; বরং ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি দেশ পান। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, প্রায় এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, খাদ্যসংকট, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন লিখেছেন- “বঙ্গবন্ধুর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভূখণ্ডকে কার্যকর রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।” তাঁর মতে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা ছিল আরও কঠিন দায়িত্ব।

তবে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তখন বিশ্ব ছিল শীতল যুদ্ধের (Cold War) দ্বিমেরু রাজনীতিতে বিভক্ত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্বাধীন বাংলাদেশ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। একই সময়ে পাকিস্তানপন্থী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও পুনর্গঠিত হতে শুরু করে। ফলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিকে অস্থির করে তোলে। এই অস্থিরতার সুযোগ নেন দেশী-বিদেশী কুচক্রী মহল।

১৫ আগস্টের ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নির্মমভাবে নিহত হন। মাত্র ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলও ঘাতকদের নির্মমতা থেকে রক্ষা পায়নি। রাজনৈতিক ইতিহাসে শিশুহত্যার এমন নিষ্ঠুরতা সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশিষ্ট লেখক ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল শুধু একজন মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়; তাঁর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কে আঘাত করা হয়েছিল।” এই মূল্যায়ন ১৫ আগস্টের প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরপরই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকারীদের বিচার থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। সংবিধানের মৌলিক নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়, সামরিক শাসনের পথ সুগম হয় এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। পরবর্তী একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের সূত্রপাত এই ঘটনারই ধারাবাহিকতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সাংবিধানিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছে। একইভাবে গবেষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মন্তব্য করেন, “১৫ আগস্ট ছিল ব্যক্তি হত্যার চেয়ে অনেক বড়; এটি ছিল রাষ্ট্রদর্শন পরিবর্তনের সূচনা।”

১৫ আগস্ট তাই শুধু একটি পরিবারের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ নয়; এটি ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক যাত্রাপথে নির্মম আঘাত। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—ক্ষমতার লিপ্সা যখন গণতন্ত্র, সংবিধান ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান পায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমগ্র জাতি। আর সে কারণেই ১৫ আগস্ট কেবল শোকের দিন নয়; এটি আইনের শাসন, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।

-মোঃ লোকমান হোসেন
সাংগঠনিক সম্পাদক, ৭১’র চেতনা।


More News Of This Category