“জয় বাংলা”—একটি দলের, নাকি একটি জাতির ইতিহাস?
বাংলাদেশে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো উচ্চারণ করলেই ইতিহাস, আবেগ এবং রাজনীতি একই সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়। “জয় বাংলা” তেমনই একটি শব্দবন্ধ। কেউ এটি উচ্চারণ করেন গর্বের সঙ্গে, আবার কেউ এই শব্দ শুনলেই অস্বস্তি বোধ করেন। প্রশ্ন হলো—”জয় বাংলা” কি সত্যিই কোনো একটি দলের সম্পত্তি, নাকি এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের কাছে। কারণ ইতিহাস আবেগে নয়, প্রেক্ষাপটে কথা বলে।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ সালে তাঁর ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতায় প্রথম “জয় বাংলা” শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। পূর্ণচন্দ্র দাসের কারামুক্তি উপলক্ষে রচিত সেই কবিতায় এই শব্দযুগল কেবল একটি শুভেচ্ছাবাক্য ছিল না; ছিল বাংলার আত্মমর্যাদা, জাতীয় জাগরণ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ঐতিহাসিক শব্দবন্ধকে রাজনৈতিক সংগ্রামের ভাষায় রূপ দেন, আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে “জয় বাংলা” হয়ে ওঠে সমগ্র বাঙালি জাতির মুক্তির রণধ্বনি।
এরপর আসে স্বাধীনতার সংগ্রামের উত্তাল সময়। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ গণরায় এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন সুসংগঠিত রূপ লাভ করে। এই পুরো রাজনৈতিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন- এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য।
সেই আন্দোলনের প্রাণের স্লোগান হয়ে ওঠে—”জয় বাংলা”।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই স্লোগান কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মুখে ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধার রণধ্বনি, শরণার্থীর আশা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুপ্রেরণা এবং মুক্তিকামী মানুষের সাহসের ভাষা। যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের রক্তে, বিজয়ের উল্লাসে এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে “জয় বাংলা” এক জাতির আত্মঘোষণায় পরিণত হয়।
“জয় বাংলা” বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ, আর সেই অর্থে সমগ্র জাতির ঐতিহ্য। তারপরও এই শব্দ শুনলেই একটা পক্ষের অস্বস্তি বোধ করেন কেনো?
গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে কোনো স্লোগান ব্যবহার করবেন কি করবেন না—সে সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার। তবে একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাসকে রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে বিচার করলে ইতিহাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করা মানে কোনো দলকে সমর্থন করা নয়; বরং একটি জাতির সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার পথচলাকে সম্মান করা।
যে শব্দ একদিন একটি পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সে শব্দের মর্যাদা কোনো দলীয় পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়।
বাংলাদেশের ইতিহাস বহু মানুষের রক্তে লেখা। সেই ইতিহাসের পাতায় “জয় বাংলা” একটি অমোচনীয় উচ্চারণ। একে সম্মান করা মানে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে সম্মান করা।
ইতিহাস আমাদের বিভক্ত হতে শেখায় না; ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে তার জন্মের ইতিহাসকে সম্মান করতে শেখে।
জয় বাংলা। জয় হোক সত্যের, জয় হোক ইতিহাসের, জয় হোক বাংলাদেশের।
সকল শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।।
লেখক – মোঃ লোকমান হোসেন,
সাংগঠনিক সম্পাদক,৭১’র চেতনা।