শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রকল্প এখনো কাগজে-কলমে
তোরণ, জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প নির্মাণে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি
চরম হতাশ ও ক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থী ও দর্শানর্থীরা
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ২০২৪-এর সেই উত্তাল আন্দোলনের পর কেটে গেছে ২০২৫ সাল, চলছে ২০২৬-এর জুলাই। অথচ গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ঘোষিত প্রায় ১ হাজার ১০ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখেনি।
বহুল আলোচিত এই প্রকল্পের আওতায় শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতি জাদুঘর, তোরণ, স্মৃতিস্তম্ভ, স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প, গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এসব স্থাপনার ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক ছাড়া বাস্তবে আর কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
এ নিয়ে আবু সাঈদের সহপাঠী, বর্তমান শিক্ষার্থী এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
তারা জানান, গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হিসেবে আবু সাঈদের নাম ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। তার আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে স্মৃতি-কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা দুই বছর পরও ভিত্তিপ্রস্তরের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার মৃত্যুই পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই স্থানটি ‘শহীদ আবু সাঈদ গেট’ নামে পরিচিতি পায় এবং গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম স্মারক হিসেবে জাতীয় গুরুত্ব অর্জন করে।
ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তিতে, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গেটে শহীদ আবু সাঈদ তোরণ ও স্মৃতি জাদুঘর এবং সংলগ্ন পার্ক এলাকায় শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
তখন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ধারণকারী একটি স্মৃতি-কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো সেই পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ।
সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে স্থাপন করা ভিত্তিপ্রস্তরের ফলকটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। আশপাশে নির্মাণকাজের কোনো প্রস্তুতি কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃশ্যমান চিহ্ন নেই।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি দেখতে এলেও সেখানে স্থায়ী কোনো স্মারক না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
কুমিল্লা থেকে আসা দর্শনার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবিদুর রহমান বলেন, “শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে—দেশ, মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য একজন তরুণও ইতিহাস বদলে দিতে পারেন। শুনেছিলাম তার স্মৃতিকে ঘিরে এখানে বড় পরিসরে কিছু নির্মাণ হবে। কিন্তু এসে দেখলাম, শুধু একটি ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক। এটা সত্যিই হতাশাজনক।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে শহীদ আবু সাঈদের নাম ব্যবহার করা হলেও তার স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
শহীদ আবু সাঈদের সহপাঠী এবং বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, “জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। অথচ প্রথম শহীদের নামে ঘোষিত তোরণ, জাদুঘর কিংবা স্মৃতিস্তম্ভের কাজই শুরু হয়নি। এটি শুধু একটি প্রকল্পের বিলম্ব নয়, বরং ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ব্যর্থতা।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক এ টি জি এম গোলাম ফিরোজ বলেন, “আমরা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) জমা দিয়েছি। এটি প্রথমে ইউজিসিতে যাবে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং সর্বশেষ একনেকে অনুমোদনের পর প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান বলেন,
“প্রকল্পটি বর্তমানে সরকারের প্রক্রিয়াধীন তালিকায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত আলীও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, “ডিপিপি ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। ইউজিসির অনুমোদনের পর এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন মিললেই মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”