রংপুরে কলেজছাত্রীর মৃত্যু
রহস্য ঘনীভূত, প্রাইভেট শিক্ষক গ্রেপ্তার
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
রংপুর নগরীর একটি আবাসিক হোটেলের ছাদ থেকে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজশাত জাহানের (১৮) মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। ঘটনার একদিন পর তার প্রাইভেট শিক্ষক ও কথিত প্রেমিক শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনকে (২৪) আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া সাকিন নগরীর ধাপ চিকলি ভাটা এলাকার বাসিন্দা এবং রংপুর মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি নিহত নুজশাতকে প্রাইভেট পড়াতেন।
তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, গত প্রায় ৯ থেকে ১০ মাস ধরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং নিয়মিত যোগাযোগ হতো।
নিহত নুজশাত জাহান রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। সোমবার বিকেলে প্রাইভেট পড়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন তিনি। পরে নগরীর সেন্ট্রাল রোড এলাকার হোটেল নর্থ ভিউয়ের ৯ তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ ও হোটেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে নুজশাত একাই হোটেলে প্রবেশ করে সরাসরি ছাদে ওঠেন। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে হাঁটাহাঁটি করতে, মোবাইল ফোনে কথা বলতে এবং পরে ছাদের রেলিংয়ের কাছে যেতে দেখা যায়। বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে তিনি রেলিংয়ের ওপর বসেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচে পড়ে যান। ওই সময় তার আশপাশে অন্য কাউকে দেখা যায়নি।
ঘটনার পর নুজশাতের বাবা নজরুল ইসলাম আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ এনে শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনসহ অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে সাকিনের সঙ্গে ছবি ও কথোপকথনের তথ্য ছিল, যার কিছু অংশ মুছে ফেলা অবস্থায় পাওয়া গেছে। এছাড়া মৃত্যুর আগে পর্যন্ত নুজশাতের সঙ্গে সাকিনের যোগাযোগ ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “কল রেকর্ড, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং বন্ধুদের বক্তব্য থেকে আমরা তাদের সম্পর্কের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নুজশাতের সঙ্গে সাকিনের কথা হয়েছে। তবে ঘটনার সময় সাকিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।”
অন্যদিকে সাকিন পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
তার ভাষ্য, নুজশাত তার শিক্ষার্থী ছিলেন এবং নুজশাত তাকে একতরফাভাবে পছন্দ করতেন। পরে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় তিনি যোগাযোগ সীমিত করেন এবং নম্বরও ব্লক করে দেন। তবে এই মৃত্যুর জন্য তিনি কোনোভাবেই দায়ী নন বলে দাবি করেন।
নিহতের মা আফসানা পারভীন বলেন, “আমার মেয়ে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল। কীভাবে বা কেন সে হোটেলের ছাদে গেল, আমরা কিছুই জানি না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে।”
পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ডিজিটাল তথ্য, কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।