*সম্পাদকীয়*
*বিশ্ব শান্তি আজ হুমকির মুখে: ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি*
*মোঃ আবুল হাসেম*
প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক বাংলার সংবাদ
চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর কাউন্সিল
বিশ্ব আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন সংকট, অন্যদিকে মিয়ানমার, সুদানসহ নানা দেশে গৃহযুদ্ধ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট, খাদ্য সংকট, সাইবার যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে — বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের করণীয় কী?
আমরা মনে করি, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু অস্ত্রবিরতি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থা।
*প্রথমত, জাতিসংঘকে সংস্কার করতে হবে।* দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো আজকের বাস্তবতার সাথে যায় না। পাঁচটি দেশের ভেটো ক্ষমতার কারণে বহু গুরুত্বপূর্ণ শান্তি প্রস্তাব আটকে যাচ্ছে। আমরা চাই, ভেটো ব্যবস্থার সংস্কার এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব ও আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক। জাতিসংঘকে শুধু নিন্দা প্রস্তাব পাশের সংস্থা না হয়ে কার্যকর শান্তি প্রতিষ্ঠার সংস্থা হতে হবে।
*দ্বিতীয়ত, নিরস্ত্রীকরণে আন্তরিক হতে হবে।* বিশ্বে আজ সামরিক খাতে ব্যয় ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, অথচ ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অর্থ নেই। বৃহৎ শক্তিগুলোকে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করে পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসে সৎ হতে হবে। একটি বুলেটের দামে একটি শিশুর এক বেলার খাবার হয় — এই সত্যটি বিশ্ব নেতাদের বুঝতে হবে।
*তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।* গবেষণা বলছে, বিশ্বের ১% মানুষের হাতে ৪৫% সম্পদ। এই বৈষম্য থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ, সন্ত্রাসবাদ ও অভিবাসন সংকট। ধনী দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিল ছাড় করতে হবে, বাণিজ্যে বৈষম্যমূলক নীতি বন্ধ করতে হবে। দারিদ্র্য দূর না করে সন্ত্রাস দূর করা যাবে না।
*চতুর্থত, সংলাপ ও মধ্যস্থতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।* প্রতিটি যুদ্ধের শেষ হয় টেবিলেই। তাহলে কেন লাখো প্রাণ ঝরার পর টেবিলে বসব? আমরা প্রস্তাব করি, প্রতিটি আঞ্চলিক সংকটে জাতিসংঘের অধীনে স্থায়ী মধ্যস্থতা সেল গঠন করা হোক।
এই দায়িত্ব কাদের?
দায়িত্ব সবার, তবে ক্রমানুসারে বেশি দায়িত্বশীল হলেন —
*১. জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ, ২. বৃহৎ শক্তি — যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ৩. আঞ্চলিক জোট, ৪. প্রতিটি জাতি-রাষ্ট্রের সরকার এবং ৫. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ।*
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি বলতে চাই, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, মানব পাচার, মাদক ও সাইবার অপরাধ আজ বিশ্ব শান্তির জন্য বড় হুমকি। এগুলো দমনে ইন্টারপোল ও জাতীয় পুলিশ সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করতে হবে। অপরাধীর কোনো জাতীয়তা নেই, তাই অপরাধ দমনে সীমান্তও থাকা উচিত নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, শান্তি কোনো উপহার নয়, এটি অর্জন করতে হয়। শান্তি মানে শুধু গোলাগুলি বন্ধ নয়, শান্তি মানে ভয়হীন জীবন, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া।
বাংলাদেশ শান্তির পক্ষে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত — শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” আমাদের পররাষ্ট্রনীতিও — সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়। এই নীতিই হতে পারে বিশ্ব শান্তির মডেল।
আসুন, আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তির পক্ষে দাঁড়াই।