শিশুদের হাতে ফিরছে বাংলার হারানো সুর
তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রপাড়ে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র শেখার নতুন উদ্যোগ
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের চরগুলোতে ধীরে ধীরে নেমে আসে নীরবতা। দিনের কোলাহল থেমে গেলে দূরের কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসে শিশুর কণ্ঠ। তার সঙ্গে মিশে যায় দোতারার টুংটাং শব্দ। একটু পর শোনা যায় বাঁশির সুর। কোথাও ঢোলের তাল। আবার কোনো শিশুর হাতে একতারা কিংবা সারিন্দা।
কয়েক বছর আগেও এমন দৃশ্য হয়তো খুব একটা চোখে পড়ত না। অথচ এক যুগ আগেও গ্রামবাংলা
র চিত্র ছিল অনেকটাই ভিন্ন। গ্রামের পথে-প্রান্তরে, বাড়ির উঠানে কিংবা কোনো মেলা ও লোকজ অনুষ্ঠানে প্রায়ই শোনা যেত বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা বাদ্যযন্ত্রের বাজনা। সুর ভেসে আসত একতারা, দোতারা, সারিন্দা, ঢোল, বাঁশি, বেহালা কিংবা খঞ্জনির। সেই সুর এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন ধীরে ধীরে দখল করে নিয়েছে গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক পরিসর। মোবাইল ফোন, ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী অনেক বাদ্যযন্ত্র এখন আর আগের মতো ব্যবহৃত হয় না। নতুন প্রজন্মের অনেক শিশুই এসব বাদ্যযন্ত্রের নাম শুনলেও সেগুলো হাতে নেওয়ার সুযোগ পায় না।
তবে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রপাড়ে যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সুর আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। শিশুদের হাতে হাতে উঠছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। কেউ দোতারা বাজানো শিখছে, কেউ সারিন্দা। কেউ বাঁশিতে সুর তুলছে, কেউ ঢোলের তালে তাল মেলাচ্ছে। একতারার একটানা সুর কিংবা খঞ্জনির ছন্দে তারা তৈরি করছে নিজেদের সুরের জগৎ।
এর পেছনে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মায়ের তরী’। শিশুদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত করা এবং সেগুলো বাজানোর দক্ষতা তৈরি করার লক্ষ্যে সংগঠনটি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তাদের এই উদ্যোগের ফলে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় আবারও শোনা যাচ্ছে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সুর।
নরওয়ের নাগরিক কবি, আলোকচিত্রী ও গবেষক উয়েরা সেথের বাংলা লোকসংস্কৃতির প্রেমে পড়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের তরী’। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রপাড়ের প্রায় ছয় শতাধিক শিশু লোকসংগীত ও বাদ্যযন্ত্র শেখার সুযোগ পাচ্ছে। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় ৯টি গুরুগৃহহে ৪৭৫ জন শিশু নিয়মিত লোকগান শিখছে। এছাড়া ৪টি বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ১২৫ জন শিক্ষার্থী বাদ্যযন্ত্র শিখছে। উচ্চতর শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশেষ “তরীর ক্লাস”, যেখানে তারা লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারায় বিশেষ জ্ঞান অর্জন করে।
মায়ের তরীর পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, ’আমরা শুধু শিশুদের বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রশিক্ষণ ও গান শেখাচ্ছি না—মানবিক ও আদর্শ মানুষ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। মায়ের তরি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি এক ধরনের আন্দোলন। আমরা সংস্কৃতির শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন করছি।”
তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে প্রবীণ শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্যও ‘মায়ের তরী’ হবে এক আশ্রয়স্থল, যেখানে প্রবীণরা তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগ করবেন নতুন প্রজন্মের সঙ্গে।”
লোকোসংগীত চর্চার সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, “‘লোকসংগীতচর্চার মাধ্যমে আত্মসিদ্ধি ও জীবনবৃদ্ধি’—এই ধারণা নিয়ে মায়ের তরী কাজ করছে। হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ সুর ও শব্দকে পুনরুজ্জীবিত করা আমাদের লক্ষ্য।” ‘বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ও এর সুর প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। মায়ের তরী সৃষ্টি হয়েছে বাংলার সংস্কৃতির শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। শিশুরা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শিখছে এবং তারা সুরও তুলছে,’ তিনি বলেন।
মায়ের তরী পরিচালিত বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সুরালয়ের গুরু লিপি দেবনাথ বলেন, একটি দোতারা কেবল চারটি তার, কাঠের কাঠামো আর একটি বাদ্যযন্ত্র নয়। একটি একতারা শুধু এক তারের সুর নয়। সারিন্দা কিংবা ঢোলও নিছক বাদ্যযন্ত্র নয়। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার মানুষের জীবন, আবেগ, উৎসব, শ্রম, আনন্দ-বেদনা ও লোকঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস।
তিনি বলেন, গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে একসময় এসব বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল খুবই স্বাভাবিক। বিয়ে, মেলা, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা লোকজ উৎসবে বাজত নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। লোকগান, ভাওয়াইয়া, বাউল, জারি-সারি, পালাগানসহ বিভিন্ন ধারার সংগীত পরিবেশনে এসব বাদ্যযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনে লোকসংগীতের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। নদী, চর, মাঠ, কৃষিজীবন এবং মানুষের সুখ-দুঃখ থেকে জন্ম নেওয়া গানগুলোকে প্রাণ দিত এসব বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। ‘আমাদের শিশুরা হাতে তুলে নিচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। এসব বাদ্যযন্ত্রে তারা সুর তুলছে। সুরের তালে তালে লোকসংগীত শিল্পীদের কণ্ঠে গাওয়া গান চারদিক মুখরিত করছে। এখন মনে হয় সুর ছিলো, আছে এবং থাকবে,’ তিনি বলেন।
গুরু নিত্যানন্দ রায় জানান, আধুনিকতার প্রবল স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক পুরোনো বাদ্যযন্ত্র। আগে যেসব বাদ্যযন্ত্র গ্রামের কারিগররা তৈরি করতেন, সেগুলোর অনেকগুলো এখন আর সহজে পাওয়া যায় না। যন্ত্র বাজানোর মানুষও কমে যাচ্ছে। ফলে বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে এগুলো বাজানোর জ্ঞান ও দক্ষতাও। এই বাস্তবতায় শিশুদের হাতে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তুলে দেওয়ার উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
’আমরা শিশুদের পথ দেখাচ্ছি। আজকের শিশুরাই আগামি দিনে আমাদের বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখবে। আধুনিকতার স্পর্শেও তারা সেই শিকড়কে ধরে রাখছে। এতেই তারা আনন্দ পাচ্ছে,’ তিনি বলেন।
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এলাকায় প্রশিক্ষণ নিতে আসা শিশুদের কাছে এসব বাদ্যযন্ত্র একদিকে যেমন নতুন, অন্যদিকে তেমনি কৌতূহলেরও বিষয়।
প্রথমবার দোতারা হাতে নিয়ে তারা হয়তো জানত না কোন তারে আঙুল রাখতে হবে। সারিন্দার সুর তুলতে গিয়ে বারবার ভুল হয়েছে। বাঁশিতে প্রথমদিকে সঠিক সুর বের হয়নি। ঢোলের তালও মিলেনি। কিন্তু অনুশীলন করতে করতে ধীরে ধীরে বদলেছে সেই দৃশ্য।
এখন তাদের আঙুলে তৈরি হচ্ছে তাল। তারে আঙুল পড়লেই উঠছে সুর। বাঁশিতে ফুঁ দিলেই ছড়িয়ে পড়ছে মিষ্টি শব্দ। ঢোলের তালে তালে অন্য শিশুরাও তাল মেলাচ্ছে।
এই শেখার মধ্য দিয়ে শিশুরা শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারছে না। তারা নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করছে।
তাদের হাতে থাকা বাদ্যযন্ত্রগুলো যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হারিয়ে যাওয়া একটি সেতুকে আবার তৈরি করছে। এক প্রান্তে রয়েছে পুরোনো দিনের গ্রামবাংলা, অন্য প্রান্তে আজকের শিশুদের পৃথিবী।
ব্রহ্মপুত্র নদেরবুকে নামাজের চর এলাকার বাসিন্দা ও লোকসংগীত শিল্পী আতোয়ার রহমান বলেন, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রপাড়ের মানুষের জীবন নদীর মতোই পরিবর্তনশীল। নদী কখনো জমি দেয়, আবার কখনো কেড়ে নেয় ঘরবাড়ি। কখনো নতুন চর জাগে, আবার কখনো ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় বসতভিটা। এই অনিশ্চিত জীবনের মধ্যেও মানুষ তার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে।
‘চরের শিশুরাও সেই সংস্কৃতিরই অংশ। তাদের শৈশব নদীর সঙ্গে, মাঠের সঙ্গে, চরজীবনের সঙ্গে। সেই জীবনে যদি নিজেদের লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তা তাদের বেড়ে ওঠাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। ‘মায়ের তরী’র প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সেই সুযোগটিই তৈরি করছে,’ তিনি বলেন।
তিনি জানান, শিশুরা যখন দলবদ্ধভাবে বাদ্যযন্ত্র বাজায়, তখন সেখানে শুধু সুরের চর্চা হয় না; তৈরি হয় এক ধরনের সামাজিক বন্ধনও। তারা একে অপরের বাজনা শোনে, ভুল শুধরে নেয়, তাল মিলিয়ে বাজানোর চেষ্টা করে। একজনের দোতারার সুরের সঙ্গে অন্যজনের বাঁশি মিশে যায়। ঢোলের তাল ধরে অন্যরা এগিয়ে যায়।
এভাবেই তৈরি হয় সম্মিলিত সুর।
দোতারা বাদক শুকলাল রায় জানান, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বা প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং নতুন প্রযুক্তি মানুষের সংগীতচর্চাকে অনেক সহজ করেছে। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে গিয়ে নিজেদের ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ সংস্কৃতি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়। সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয়ের অংশ।
যে শিশু আজ দোতারা বাজাতে শিখছে, সে হয়তো আগামী দিনে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও বাজাবে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গান শুনবে, আধুনিক সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে যদি সে জানে তার নিজের মাটির গান কী, কোন বাদ্যযন্ত্রে সেই গান বাজানো হয়, তাহলে তার সাংস্কৃতিক পরিচয় আরও গভীর হবে। এই জায়গাটিতেই ‘মায়ের তরী’র উদ্যোগের গুরুত্ব।
’শিশুদের আধুনিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়, বরং আধুনিকতার পাশাপাশি তাদের নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়া—এই ভাবনাই এমন উদ্যোগকে অর্থবহ করে তুলতে পারে,’ তিনি বলেন।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃষ্ণা রায় জানান, ‘দোতারার সুর খুবই ভালো লাগে। প্রথমে দোতারা বাজাতে শিখেছি। এরপর বাঁশি, সারিন্দা ও ঢোল বাজাতে শিখেছি। এখন সব ধরনের বাদ্যযন্ত্রই বাজাতে পারছি। মায়ের তরী আমাদেরকে শিখিয়েছে কিভাবে শিকড়কে ধরে বাঁচতে হয়।’
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সজিব রায় জানান,’ আমি প্রথমে বাঁশি বাজাতে শিখেছি। বাঁশি বাজাচ্ছি। এখন সারিন্দা ও দোতারা বাজানোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছি।’
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অবিনাশ রায় বলেন,’ সারিন্দা বাজানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। সারিন্দা বাজাচ্ছি নিয়মিত। সারিন্দার সুর সবাইকে বিমোহিত করে তোলে। আমার খুব ভালো লাগে।’
বেহালা প্রশিক্ষক সহিদুজ্জামান জামান, ‘শিশুরা বেহালা বাজাতেও দক্ষ হয়ে উঠছে। মায়ের তরীর মাধ্যমে শিশুরা প্রায় সকল ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী হয়ে উঠেছে।’ ‘বেহালা শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য,’ তিনি বলেন।
ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে শুধু শিল্পীরাই যুক্ত নন। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় কারিগরদের জীবন ও দক্ষতাও। দোতারা, একতারা কিংবা সারিন্দা তৈরি করতে কাঠ নির্বাচন থেকে শুরু করে কাঠের আকৃতি দেওয়া, তার বসানো, বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো এবং সুর ঠিক করার মতো নানা ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। ঢোল বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তৈরিতেও রয়েছে নিজস্ব কারিগরি জ্ঞান।
বাদ্যযন্ত্র কারিগর অজিত কুমার সুত্রধর জানান, এক যুগ আগে বাদ্যযন্ত্র তৈরির চাহিদা ছিলো ব্যাপক। অনেক কারিগর পেশা ছেড়ে দিয়েছে। েএখন আর মানুষ বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে তাদের কাছে আসেন না। সম্প্রতি সময়ে নতুনভাবে চাহিদা তৈরি হচ্ছে। তবে চাহিদা একবোরে কমে গেলে বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরিও হারিয়ে যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যদি আবার এসব বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে, তাহলে একসময় হারিয়ে যেতে বসা সেই কারিগরিরও নতুন করে চাহিদা তৈরি হতে পারে।
’একটি বাদ্যযন্ত্র শেখানোর মধ্য দিয়ে শুধু একটি সুরকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও কারিগরি ঐতিহ্যকেও টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে,’ তিনি বলেন।
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রপাড়ে এখন যখন কোনো শিশুর হাতে দোতারা দেখা যায়, তখন সেটি শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রের দৃশ্য নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে বাংলার হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি।
যখন কোনো শিশু একতারায় সুর তোলে, তখন মনে হয় সেই সুরের সঙ্গে যেন ফিরে আসছে বাংলার লোকজ জীবনের একটি অংশ। সারিন্দার সুরে মিশে থাকে পুরোনো দিনের আবেগ। বাঁশির সুরে মিশে যায় নদী ও মাঠের বাতাস। ঢোলের তালে ফিরে আসে উৎসবের স্মৃতি। এই শিশুরাই হয়তো একদিন সেই সুরকে আরও দূরে নিয়ে যাবে।
আজ তারা শিখছে। আগামীকাল তারা অন্য কাউকে শেখাবে। এভাবেই একটি সংস্কৃতি বেঁচে থাকে—এক প্রজন্মের হাত থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে পৌঁছে।
তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরের বাতাসে তাই এখন শুধু নদীভাঙন, বন্যা কিংবা জীবিকার অনিশ্চয়তার গল্প নেই। সেখানে আছে নতুন একটি গল্পও—হারিয়ে যেতে বসা বাংলার সুরকে ফিরিয়ে আনার গল্প।
নদী যেমন তার গতিপথ বদলায়, তেমনি সময়ও বদলে দেয় মানুষের জীবন। কিন্তু কিছু সুর থাকে, যা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। সেগুলো মানুষের মাটি, মানুষ ও শিকড়ের সঙ্গে মিশে থাকে। সেই সুর বাঁচিয়ে রাখতেই এখন ছোট ছোট হাত এগিয়ে এসেছে।
তাদের হাতে দোতারা, একতারা, সারিন্দা, বাঁশি, ঢোল, বেহালা ও খঞ্জনি। তাদের আঙুলে তাল, ঠোঁটে সুর। আর তাদের চোখে নিজেদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার স্বপ্ন।
হয়তো একদিন আবার বাংলার গ্রামগুলোতে সন্ধ্যা নামার পর দূর থেকে ভেসে আসবে সেই পরিচিত সুর। কোনো উঠানে বসবে গান, কোনো চরে বাজবে দোতারা, কোনো নদীপাড়ে শোনা যাবে বাঁশির মায়াবী সুর।
সেদিন হয়তো মনে হবে—বাংলার শিকড় হারিয়ে যায়নি। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে তা আবারও ফিরে এসেছে।
সুরের ভেতর দিয়ে।