মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৫ অপরাহ্ন
Headline :
সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে প্রেসক্লাব থেকে সাংবাদিক আশিক বহিষ্কার নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি-দখল: ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দায় নিচ্ছে পুরো দল? নিজস্ব প্রতিবেদক ফাঁকা চেয়ার, ভরা মূল্যঃ ব্রিকসে বাংলাদেশের নীরব প্রস্থান কুয়েতে শিক্ষাখাতে বড় পরিবর্তন প্রায় ৭ হাজার চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকের চাকরি শেষ করার পরিকল্পনা। ঠাকুরগাঁওয়ে রাণীশংকৈলে ২৬০ ইয়াবাসহ তিনজন গ্রেপ্তার আরমান হোসেন রাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২ *হাসনাবাদে ত্যাগী নেতাকে চেয়ারম্যান পদে জনাব আব্দুল মজিদ ভূইয়া কে সমর্থনের আহ্বান জানান, আবুল হাসেম ডিলারের* কলমের গায়ে দাগ কলমে /সাংবাদিক এম বাদল খন্দকার। অপেক্ষার অবসান! পীরগঞ্জে এই প্রথম আন্তর্জাতিক মানের জীম!শীঘ্রই শুভ দিনাজপুরে আদা চাষের আড়ালে গাঁজা চাষ! যুবক গ্রেপ্তার আরমান হোসেনরাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২ রাজাপুরের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা “নাছিম সোহেল”-কে উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেখতে চান আলমগীর শরীফ, ঝালকাঠি প্রতিনিধি

বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি-দখল: ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দায় নিচ্ছে পুরো দল? নিজস্ব প্রতিবেদক

Update : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি-দখল: ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দায় নিচ্ছে পুরো দল?

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতির মাঠে সক্রিয় কোনো পদ-পদবি নেই। স্থানীয় বিএনপির কোনো কমিটিতেও নেই আনুষ্ঠানিক পরিচয়। তবে স্থানীয় এক নেতার ডাকে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে নিয়মিত অংশ নেওয়ার সূত্র ধরে নিজেকে বিএনপির কর্মী ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কামরুজ্জামান ওরফে আপন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে রাজধানীর বুয়েট নিয়ন্ত্রিত পলাশি বাজারে দোকান দখল, ভাড়া বন্ধ করে দেওয়া এবং দোকান মালিকদের ভয়ভীতি দেখানোর মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কামরুজ্জামান আপনের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারী ও স্থানীয় দোকান মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কামরুজ্জামান আপন নিজেকে পলাশি কাঁচাবাজারের ‘সেক্রেটারি’ এবং বাজারটি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। যদিও তার কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পদ-পদবি আছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, কামরুজ্জামান আপন চাঁদপুরের দক্ষিণ মতলবের দক্ষিণ নাগদা এলাকার ফজর আলী প্রধানের ছেলে। পলাশি বাজারে তিনি নিজে একজন দর্জি হিসেবে কাজ করেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে তাকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে দেখা যেত। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নিজেকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়।

স্থানীয় দোকান মালিকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় নিজের প্রভাব তৈরি করেন। এরপর পলাশি বাজারের দুটি দোকান দখলের চেষ্টা ও দোকান মালিকদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে দোকান মালিক লায়লা পারভীন নিজেকে অসহায় ও একা দাবি করে অভিযোগ করেন, তার পারিবারিকভাবে কোনো শক্তিশালী সহায়তা নেই। এই সুযোগে তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রথমে দোকানের ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে দোকানটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি এবং দোকান দখলের চেষ্টা করা হয় বলে তার অভিযোগ।

পরিস্থিতিতে পলাশি বাজারের কয়েকজন দোকান মালিকের সহযোগিতায় চকবাজার থানায় অভিযোগ করেন লায়লা পারভীন।

পুলিশের তদন্তে কী পাওয়া গেল

চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, লায়লা পারভীন থানায় অভিযোগ করার পর বিষয়টি তদন্ত করা হয়। তদন্তে কামরুজ্জামান আপনের ভাড়া পরিশোধ না করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।

পুলিশের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে কামরুজ্জামান আপনের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বকেয়া ভাড়া পরিশোধ এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত ভাড়া দেওয়ার মৌখিক অঙ্গীকার করেন।

তবে দোকান দখল, ভয়ভীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশের তদন্তে কী সিদ্ধান্ত এসেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আরেক দোকান মালিকের অভিযোগ

পলাশি বাজারের আরেক দোকান মালিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ফজলুল করিমও কামরুজ্জামান আপনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।

তার দাবি, কামরুজ্জামান তার কাছ থেকে দোকান ভাড়া নেওয়ার পর একপর্যায়ে ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেন। বকেয়া ভাড়া চাইতে গেলে তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং দোকান ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

ড. ফজলুল করিমের অভিযোগ, কামরুজ্জামান নিজেকে স্থানীয় বিএনপি নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।

এই অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতার সঙ্গে কামরুজ্জামান আপনের সম্পর্কের প্রকৃতি এবং ওই নেতার পক্ষ থেকে তাকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

নিজ এলাকায়ও অভিযোগের কথা

কামরুজ্জামান আপনের নিজ এলাকা চাঁদপুরের দক্ষিণ মতলবেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জবরদখল এবং মারধরের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কয়েকজনকে কুপিয়ে আহত করে জমি দখলের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

তবে এসব মামলার মামলা নম্বর, অভিযোগের ধারা, বর্তমান অবস্থা এবং আদালতের কোনো রায় রয়েছে কি না, তা যাচাই না করে চূড়ান্তভাবে তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট থানার নথি ও আদালতের রেকর্ড যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

তাহলে বিএনপির দায় কতটুকু?

কামরুজ্জামান আপনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ঘিরে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না থাকলেও তিনি যদি কোনো নেতার মিছিল-মিটিংয়ে নিয়মিত অংশ নেন এবং সেই পরিচয় ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে তার কর্মকাণ্ডের দায় কি পুরো রাজনৈতিক দলের ওপর বর্তাবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দলের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মাত্রই কাউকে ওই দলের পদধারী নেতা বা সাংগঠনিক প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একইভাবে কোনো ব্যক্তি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে তার সঙ্গে দলের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।

অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের জন্য বিষয়টি এত সরল নয়। স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি যদি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দেন এবং সেই পরিচয়ের কারণে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে ভয় পান, তাহলে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করার।

কারণ, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যদি দিনের পর দিন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে থেকে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো দলের ভাবমূর্তির ওপর।

‘অনুপ্রবেশকারীদের’ লাগাম টানার দাবি

বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি, দখল বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিত হওয়া আর দলের আনুষ্ঠানিক কর্মী বা নেতা হওয়া এক বিষয় নয়।

তাদের দাবি, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সুযোগসন্ধানীদের পরিচয় যাচাই না করলে ভবিষ্যতে আরও অনেকে দলীয় পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হবে, অন্যদিকে পুরো দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পলাশি বাজারের ঘটনাটিও তাই শুধু একজন দোকান মালিক ও একজন দোকান ব্যবহারকারীর বিরোধ হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক প্রভাবটি আড়ালে থেকে যেতে পারে। অভিযোগগুলো সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়ায় একজন ব্যক্তি কীভাবে স্থানীয় একটি বাজারে নিজের প্রভাব তৈরি করতে পারলেন এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টি আগে কেন জানতে পারল না।

আর অভিযোগগুলো সত্য না হলে, কামরুজ্জামান আপনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও যথাযথ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করা যেমন গুরুতর অভিযোগ, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমানভাবে অনুচিত।

ফলে পলাশি বাজারের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন মূল প্রশ্ন একটাই: কামরুজ্জামান আপন কি সত্যিই কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী কর্মী, নাকি রাজনৈতিক নেতাদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থে সেই পরিচয় ব্যবহার করছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে দলীয় নথি, থানার অভিযোগ, তদন্তের ফল, দোকানের মালিকানা ও ভাড়ার কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর।

এসব নথি ও তথ্য প্রকাশ্যে এলে স্পষ্ট হবে, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অংশ, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের একটি স্থানীয় ঘটনা।


More News Of This Category