ফাঁকা চেয়ার, ভরা মূল্যঃ ব্রিকসে বাংলাদেশের নীরব প্রস্থান
নয়াদিল্লিতে যখন ব্রিকসের নেতারা “গ্লোবাল সাউথের” ভবিষ্যৎ লিখছিলেন, বাংলাদেশের চেয়ারটা ছিল ফাঁকা। এই ফাঁকা চেয়ারটাই বলে দেয় অনেক কিছু।
যুক্তি দেওয়া হলো প্রোটোকলের — প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নাকি ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে নয়, বিমসটেক-এর ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাই ঢাকা গেল না। কিন্তু এই ব্যাখ্যা যত সহজে দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবতা তত সহজ নয়। একটা রাষ্ট্র যখন এমন এক মঞ্চ এড়িয়ে যায় যেখানে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা আর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক — এই দূরত্ব কি শুধুই মর্যাদার লড়াই, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো হিসাব কাজ করছে?
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকালে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয় — যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান নৈকট্য, আর সেই নৈকট্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠ যে কোনো বহুপাক্ষিক মঞ্চ থেকে সতর্ক দূরত্ব। ব্রিকস এমন একটা জোট যা প্রকাশ্যেই ডলার-নির্ভরতা কমানো আর পশ্চিমা আর্থিক আধিপত্যের বিকল্প খোঁজার কথা বলে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে যে সরকারের সম্পর্ক যত নিবিড়, তার পক্ষে এমন একটা মঞ্চে সরাসরি উপস্থিত থাকা তত রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর — প্রকাশ্যে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, এই অলিখিত সীমারেখা ছোট রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রায়ই পরোক্ষভাবে কাজ করে।
এই সম্মেলনে “নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র” গৃহীত হয়েছে, যেখানে গ্লোবাল গভর্নেন্স সংস্কার, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমন এবং বাণিজ্য-পেমেন্ট ব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইথিওপিয়া, মিশর, ইরান ও আমিরাতের মতো নতুন সদস্যদের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ — জোটের সম্প্রসারণের পর তারা প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে আলোচনার টেবিলে বসছে, যা তাদের জাতিসংঘ সংস্কার ও বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে দর কষাকষির শক্তি বাড়ায়। রাশিয়ার জন্য এটা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বলয়ে বিকল্প বাণিজ্য-নেটওয়ার্ক প্রদর্শনের সুযোগ। চীনের জন্য এটা ডলার-নির্ভরতা কমানোর এজেন্ডাকে এগিয়ে নেওয়ার মঞ্চ।
আর এখানেই ক্ষতিটা অপূরণীয়। ভারত যখন একইসঙ্গে শি জিনপিং, পুতিন আর পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে টেবিলে বসার সামর্থ্য দেখাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ প্রমাণ করছে ঠিক তার উল্টোটা — যে তার কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে। এই সম্মেলন ছিল মোদির সঙ্গে সরাসরি প্রথম বৈঠকের সুযোগ, তিস্তা-বাণিজ্য-সীমান্ত জট খোলার সুযোগ, আর সবচেয়ে বড় কথা — বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজের আসনটা বুক করে রাখার সুযোগ। ব্রিকসের সদস্যপদের দৌড়ে যে দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ আরও একধাপ পিছিয়ে পড়ল এবং গ্লোবাল নেটওয়ার্ক থেকে পিছিয়ে পড়ল।
একটা ছোট, উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বহুমুখী কূটনীতিই টিকে থাকার একমাত্র পথ। কোনো একটামাত্র শক্তির সন্তুষ্টির জন্য অন্য সব দরজা বন্ধ করে ফেলা — সাময়িক নিরাপত্তার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ারই নামান্তর। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির টেবিলে বাংলাদেশের চেয়ারটা ফাঁকা ছিল — আর সেই ফাঁকা চেয়ারই ছিল একটা জাতির সংকুচিত হয়ে আসা বিশ্ব-পরিসরের নীরব সাক্ষী।
লেখক – মোঃ লোকমান হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক, ৭১’র চেতনা।