ইয়েমেনে হাজার কোটি ডলার ঢালার পরও কেন সৌদি ও আমিরাতের বানানো ছায়া বাহিনীগুলো হুতিদের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল? ইয়েমেন সংকটের পেছনের এই অপ্রিয় ও নির্মম গল্পটা একটু গভীরে গিয়ে বোঝা যাক।
মো লুৎফুর রহমান রাকিব
আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি
এখানে একটা জনসংখ্যার খেলা আছে।উপসাগরীয় দেশ সৌদিআরব,কাতার,কুয়েত,আমিরাত, বাহরাইন আর ওমাননের মোট জনসংখ্যা মাত্র ২.৭০ কোটির মতো।
আর সেখানে একা ইয়েমেনের জনসংখ্যাই প্রায় ৪ কোটি!
তাই উপসাগরীয় এই ধনী দেশগুলো সবসময় একটা স্বাধীন ও শক্তিশালী ইয়েমেনকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি মনে করে এসেছে।
তাদের হিসাব ছিল এরকম -ইয়েমেনকে হয় সৌদির নিয়ন্ত্রিত গোলাম হয়ে থাকতে হবে,না হয় আমেরিকান ছাতার নিচে আসতে হবে।
আমেরিকান বা উপসাগরীয় বলয়ের বাইরে কোনো স্বাধীন সার্বভৌম ইয়েমেন তাদের সহ্য না।
ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ পতনের পর যখন ‘ইসলাহ’ পার্টি প্রভাবশালী হয়ে উঠল,তখন আরব বসন্তের পর সৌদি এবং আরব আমিরাত আবার এই ইসলাহ দলের পেছনেও লাগলো।
এই ভেতরের ক্যাচালের সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে বসলো ইরানের সমর্থন পাওয়া হুতিরা।
সানা দখলের পরপরই হুতিরা দ্রুত লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ দিকে উপকূলীয় এলাকার দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্ট বাব-আল-মানদেব প্রণালীর নিকটে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে আসে।
বর্তমানে লোহিত সাগরে তারা যে বৈশ্বিক জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে,তার মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ২০১৪ সালের এই সানা দখলের মাধ্যমেই।
ইয়েমেনের ক্ষমতা হুতিদের হাতে যাওয়া মানে ছিল সৌদি আরবের পাশেই ইরানের শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি হওয়া।
লেবাননের হিজবুল্লাহ,ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারের পর ইরান ইয়েমেনেও নিজেদের একটি শক্ত ঘাঁটি পেয়ে যায়।
খুব কম খরচে ইরান ইয়েমেনের মাধ্যমে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবকে কোণঠাসা করার কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যায়।
তখন হুতিদের ঠেকানোর জন্য সৌদি এবং আমিরাত ইয়েমেনে নিজেদের কথামতো চলা হরেক রকমের সশস্ত্র দল গড়ে তুলে এবং টাকা ঢালতে শুরু করে।
যেমন আমিরাত সমর্থন দিল ‘জায়ান্টস ব্রিগেড’কে,আর সৌদি টাকা ঢালল নেশনস শিল্ড, ইমার্জেন্সি ফোর্স আর হাদরামি উপজাতিদের পেছনে।
এখান থেকেই সৌদি-আমিরাত বনাম ইরানের ক্যাচালটা তৈরি হয়।
সৌদি এবং আমিরাত চেয়েছে টাকা দিয়ে উপজাতিদের আনুগত্য কিনতে।
যোদ্ধাপ্রতি মাসে প্রায় ১০০০ সৌদি রিয়াল বেতন দেওয়া হতো। যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক ধসের কারণে পেট চালাতে বাধ্য হয়ে ইয়েমেনি তরুণরা এই বাহিনীগুলোতে যোগ দেয়।
অর্থাৎ এরা যুদ্ধ করতে নেমেছিল পেটের দায়ে।বেতনের জন্য।
আর অন্যদিক ইরান খেলল ভিন্ন এক আদর্শের খেলা।হুতিদের ওপর নিজেদের হুকুম না চাপিয়ে ইরান তাদের হাতে সামরিক টেকনোলজি ও অস্ত্রশস্ত্র তুলে দেয়,
আর মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে দেয় ইয়েমেনিদের এসমস্ত দলের হাতেই।
এর মধ্যে আবার সৌদি এবং আমিরাতের নিজেদের ভেতরের স্বার্থ নিয়ে কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে গেল!
মাত্র ১১ লাখ নাগরিকের দেশ আমিরাত ভাবল,আস্ত একটা শক্তিশালী ইয়েমেন না রেখে এসটিসি -র মাধ্যমে উত্তর আর দক্ষিণ ইয়েমেনকে দুটি আলাদা দেশে ভাগ করে দেওয়া যাক।
এতে তাদের প্রভাবও বজায় থাকবে, আবার নিজেদের জনসংখ্যার হীনমন্যতাও কাটবে।
মজার ব্যাপার হলো,এই একটা দেশকে ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করার গেমটা কিন্তু ইসরায়েলেরও খুব পছন্দের ছিল।যেমনটা তারা সিরিয়াতে কুর্দি আর দ্রুজদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র বানানোর খেলায় চেষ্টা করেছে।
কিন্তু আমিরাতের এই ভাঙনের চালের কারণে সৌদির সাথে তাদের তীব্র বিরোধ তৈরি হয় এবং অনেকদিন ক্যাচাল চলে।পড়ে সেই খেলায় শেষ পর্যন্ত আমিরাত ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত হলো।
এখন মূল প্রশ্নে আসি -এত হাজার হাজার কোটি ডলার ঢালার পরও সৌদি শিবির কেন ইয়েমেনে পুরোপুরি ধরাশায়ী হলো এখন?
কারণগুলো বলা যায় খুবই ক্লিয়ার।
এক,
হুতিদের ছিল সানা থেকে পরিচালিত একটিমাত্র কেন্দ্রীয় কমান্ড আর কঠোর শৃঙ্খলা,অন্যদিকে সৌদি শিবির ছিল শতভাগে বিভক্ত ভাড়াটে বিভিন্ন উপদল।
দুই,
সৌদি তাদের বিমান শক্তি দিয়ে হুতিদের থামাতে পারেনি,কারণ হুতিরা পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সরাসরি সৌদিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছিল।
তিন,
হুতি যোদ্ধাদের চিন্তায় ছিল ইসরায়েল ও আমেরিকা বিরোধী এক কট্টর ধর্মীয় আদর্শ,যার জন্য তারা জীবন দিতে প্রস্তুত; কিন্তু সৌদি পক্ষের লোকগুলো ফাইট করছিল স্রেফ মাসের শেষে ১০০০ রিয়াল বেতনের জন্য।
সবচেয়ে মারাত্মক ধাক্কাটা ছিল সৌদির নিজেদের মোবিলাইজেশনের ভণ্ডামি!
একজন ইয়েমেনি যোদ্ধা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে দেখে যে তাদের পেছনে বসে কমান্ড দিচ্ছে ২০০ জন আমেরিকান অফিসার,আর টিভিতে দেখছে সৌদি মিডিয়া গা**জা*য় ফি/লস্তনিদের পক্ষে কথা না বলে ইসরায়েলের দালালি করছে,
আর গাজায় হামলা চালানো আমেরিকানদের সাফাই গাইছে -তখনই সৌদি ধর্মীয় প্রচারণার কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হয়ে যায়!
বেতনের জন্য যুদ্ধ করা একজন মুসলিম যোদ্ধারও তখন বুঝে নিতে বাকি থাকে না, কারা কার হয়ে লড়াই করছে।
টাকার জোরে ভাড়াতে সৈন্য পোষা যায়,কিন্তু নির্দিষ্ট আদর্শ সামনে রেখে লড়া দলের সামনে তারা কখনোই টিকতে পারে না।