দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৫০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক
শিক্ষক সংকটে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা।
লালমনিরহাটর জেলা পতিনিধি
রওশন বাবু
০১৭২৫১৯২৪২৪
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় সীমান্তঘেরা দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৫০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট চরমে পৌঁছেছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান কার্যত ভেঙে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। অবিলম্বে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে সোমবার থেকে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে চারদিক ভারতীয় ভূখণ্ডে বেষ্টিত দহগ্রাম ইউনিয়ন। ঐতিহাসিক তিনবিঘা করিডোর অতিক্রম করেই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এই জনপদের যোগাযোগ। সীমান্তবর্তী এই ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৭৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৩ সালে এটি সরকারিকরণ করা হয়। কিন্তু সরকারিকরণের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় বিদ্যালয়টি এখন ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৫৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ৩২০ জন ছাত্রী এবং ২৩০ জন ছাত্র। অথচ পাঠদান চালিয়ে যেতে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক। এছাড়া একজন তৃতীয় শ্রেণির ও একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কর্মরত আছেন।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে বিষয়ভিত্তিক ২৫ জন শিক্ষক এবং প্রশাসনিক দুটি পদ থাকার কথা। কিন্তু সরকারিকরণের সময় মাত্র সাতজন শিক্ষক অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গত চার বছরে ওই সাতজনের মধ্যে ছয়জন অবসরে চলে গেছেন। সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই বিএসসি শিক্ষক অবসরে গেলে বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষক অবশিষ্ট থাকেন। তিনিও ২০২৮ সালের মার্চে অবসরে যাবেন।
শিক্ষার্থীরা জানায়, একজন শিক্ষক প্রতিদিন সর্বোচ্চ পাঁচটি ক্লাস নিতে পারছেন। ফলে অধিকাংশ শ্রেণিতে নিয়মিত পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে সোমবার থেকে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের ঘোষণা—শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়া পর্যন্ত তারা শ্রেণিকক্ষে ফিরবে না।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাজানা আক্তার বলেন, “শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়ে কোনো পড়াশোনা হচ্ছে না। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে এসে শুধু সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে তো একটি বিদ্যালয় চালানো সম্ভব নয়। শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরব না।”
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম বলেন, “নামে সরকারি বিদ্যালয় হলেও এখানে শিক্ষক নেই, নিয়মিত ক্লাস নেই, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও নেই। কয়েক বছর স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষিত যুবক স্বেচ্ছাশ্রমে আমাদের পড়াতেন। তারা চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার পর সেই ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে। গত ১৪ জুলাই বিএসসি স্যার অবসরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।”
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারুফা আক্তার বলেন, “প্রায় এক বছর ধরে আমরা ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছি না। এতে আমরা অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়ছি। এমনিতেই আমাদের এলাকা অবহেলিত। এখন শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।”
অভিভাবক নুর ইসলাম বলেন, “দহগ্রামে যাতায়াতের একমাত্র পথ তিনবিঘা করিডোর। উপজেলা শহরে গিয়ে পড়াশোনা করা অধিকাংশ পরিবারের জন্য সম্ভব নয়। তাই এই বিদ্যালয়ই আমাদের একমাত্র ভরসা। অথচ এখানে শিক্ষক নেই। সরকারের উচিত দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।
আরেক অভিভাবক সাহেদুর রহমান বলেন, “সামর্থ্য থাকলে আমি সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতাম না। কিন্তু বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েছি। একজন শিক্ষক দিয়ে একটি বিদ্যালয় চলতে পারে না। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ না হলে এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
বিদ্যালয়ের একমাত্র কর্মরত শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক ফরিদুল ইসলাম বলেন, “গত ১০ বছরে অন্তত ১৫ বার শিক্ষকের চাহিদাপত্র উপপরিচালকের কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন কোনো শিক্ষক পোস্টিং দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর পুরো বিদ্যালয়ের দায়িত্ব আমার একার কাঁধে এসে পড়েছে।
তিনি বলেন, “বিদ্যালয়টি অত্যন্ত দুর্গম সীমান্ত এলাকায় হওয়ায় অনেক শিক্ষক এখানে যোগ দিতে আগ্রহী হন না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই বিদ্যালয়সহ সীমান্তবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাহলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই দূর হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি ২০২৮ সালে অবসরে যাব। এরপর যদি নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হয়, তাহলে বিদ্যালয়টি কার্যত শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সীমান্ত এলাকার দরিদ্র ও নারী শিক্ষার্থীরা।”
ফরিদুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন তহবিল থেকে সামান্য সম্মানী দিয়ে মাঝে মধ্যে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের দিয়ে ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ অনেকেই চাকরির কারণে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। বর্তমানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রংপুর অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার উপপরিচালক রোকসানা বেগম বলেন, “দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটে ভুগছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। মঙ্গলবার বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মহাপরিচালক বরাবর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। আশা করছি মহাপরিচালক এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন।