তেল-বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে সরকার, জ্বালানি বাজারে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতাই কি সমাধান?
আওরঙ্গজেব কামাল :
দেশের জ্বালানি খাত এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে গ্যাসের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সচল রাখতে বাড়ছে ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা। আবার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, নৌপথে অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কম উৎপাদন করছে; আর ঘাটতি পূরণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে গিয়ে আবার তেলের মজুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। যেন এক সংকট সামাল দিতে গিয়ে আরেক সংকটের জন্ম হচ্ছে।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে ৫৩টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন ফার্নেস অয়েল চেয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড—পিডিবি। কিন্তু বিপিসির সম্ভাব্য সরবরাহের সঙ্গে এই চাহিদার বড় ব্যবধান রয়েছে। অন্যান্য খাতের চাহিদা বাদ দিলেও শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এটি নিছক একটি জ্বালানি সংকট নয়; এটি আমাদের জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারও শত চেষ্টার পরেও কোন কুল কিনার পাচ্ছেনা এমন মত বিশেষজ্ঞদের। জ্বালানি নিরাপত্তা কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ? সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশে পড়ে। যুদ্ধ হলে ঝুঁকি বাড়ে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা দেখা দিলে সরবরাহ ব্যাহত হয়, ডলারের বিনিময় হার বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থাৎ আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করছে এমন কিছু বিষয়ের ওপর, যার ওপর বাংলাদেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—কেন আমরা দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত, বিকল্প আমদানি উৎস এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি? শুধু সংকট দেখা দিলে তেল আমদানি করে সমস্যার সমাধান করার নীতি আর কতদিন চলবে?
বেসরকারি খাতকে সুযোগ—সময়োপযোগী, তবে সতর্কতা জরুরি। জ্বালানি তেলের বাজারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসির পাশাপাশি সীমিত পরিসরে বেসরকারি খাতকে আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বেসরকারি খাতকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বাজারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে, সংরক্ষণাগার ও ডিপো বাড়তে পারে, পরিবহন অবকাঠামো উন্নত হতে পারে এবং সংকটকালে বিকল্প সরবরাহের পথ তৈরি হতে পারে। নীতিগতভাবে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
কিন্তু এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যেন বেসরকারি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি না হয়। একটি সিন্ডিকেটের পরিবর্তে যদি কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। জ্বালানি তেলের মতো কৌশলগত পণ্যে এমন ঝুঁকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রতিযোগিতা চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বাজার নয়
জ্বালানি তেলের বাজারে প্রতিযোগিতা দরকার। কিন্তু প্রতিযোগিতার অর্থ নিয়ন্ত্রণহীন বাজার নয়। সরকারকে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবসার সুযোগ পাবে, কিন্তু বাজার কারসাজি করার সুযোগ পাবে না।
কোন প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারবে, তার আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা কতটুকু হতে হবে, কত দিনের জ্বালানি মজুত রাখতে হবে, সংকটের সময়ে কী পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে, পণ্যের মান কীভাবে পরীক্ষা হবে, মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—প্রতিটি বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা, নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহ কিংবা বাজার ভাগাভাগির মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিপিসিকে দুর্বল নয়, আরও কৌশলগত করতে হবে
বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার অর্থ বিপিসির গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া নয়।
বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপিসির ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করা দরকার। সাধারণ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিপিসিকে জাতীয় কৌশলগত জ্বালানি মজুত, জরুরি আমদানি, সংকটকালীন সরবরাহ এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্র কৌশলগত জ্বালানি মজুত ধরে রাখে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাজারে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশেও এমন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায়? বর্তমানে নেপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ। সেখান থেকেও আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। তাহলে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। গ্যাসের সংকট থাকলে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, কিন্তু তার খরচ বেশি। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, আর সেই ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, বিদ্যুৎ খাত এবং ভোক্তার ওপর পড়ে।
তাই বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি সরবরাহের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
শিল্পকারখানার সংকটকে অবহেলা করা যাবে না
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে দেশের উৎপাদন খাত।
তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও গ্যাসের চাপ কম, কোথাও বিদ্যুৎ নেই। ফলে উৎপাদন ধরে রাখতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এতে ব্যবসার খরচ বাড়ছে, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে এবং রপ্তানির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
একটি দেশের শিল্পখাত যদি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পায়, তাহলে শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সংকট থাকে না—তার প্রভাব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যায়। মূল্য নির্ধারণে দরকার স্বচ্ছতা।বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাজারে এলে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও তার সুফল দ্রুত পৌঁছাতে হবে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ভোক্তাকে হঠাৎ করে বড় ধাক্কা দেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক ও পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় রেখে স্বচ্ছ এবং পূর্বনির্ধারিত কাঠামোতে মূল্য সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এখানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯০ দিনের মজুতশুধু ঘোষণা নয়, বাস্তব সক্ষমতা চাই।
সংকট কালে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত থাকা অপরিহার্য।
সরকার ৯০ দিনের জ্বালানি মজুতের লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু শুধু কাগজে মজুতের পরিকল্পনা থাকলেই হবে না। কোথায় মজুত থাকবে, কত দ্রুত তা ব্যবহার করা যাবে, বন্দরে জাহাজ আটকে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ বন্ধ হলে কতদিন দেশ চালানো সম্ভব—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর থাকতে হবে। আজকের সংকট আগামী দিনের শিক্ষা
বর্তমান তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আমাদের সামনে একটি বড় শিক্ষা তুলে ধরেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু তেল আমদানি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা হলো—বহুমুখী আমদানি উৎস, পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, শক্তিশালী পরিবহন অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সংকটকালীন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
এখানে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ হতে হবে নিয়মের মধ্যে, স্বচ্ছতার মধ্যে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে।
আমরা মনে করি, জ্বালানি তেলের বাজারে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগকে অযথা ভয় পাওয়ার কারণ নেই। আবার অন্ধভাবে স্বাগত জানানোরও সুযোগ নেই।
সঠিক নীতিমালা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত মজুত এবং শক্তিশালী প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।
কিন্তু কোনোভাবেই যেন বিপিসির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের জায়গায় নতুন কোনো বেসরকারি সিন্ডিকেট জন্ম না নেয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে জ্বালানি তেল কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ, খাদ্য উৎপাদন এবং দেশের অর্থনীতি সরাসরি জড়িত।
তাই জ্বালানি বাজারের সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসায়ীদের সুবিধা নয়, জনস্বার্থ ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা।
আমাদের প্রত্যাশা—সরকার এমন একটি জ্বালানি বাজার গড়ে তুলবে, যেখানে থাকবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পর্যাপ্ত মজুত, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং যৌক্তিক মূল্য।
কারণ আজকের জ্বালানি সংকট শুধু সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
লেখক ও গবেষক:
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি, ঢাকা প্রেসক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব