ডেঙ্গু প্রতিরোধে বর্ষাকাল নয়, বছরব্যাপী টেকসই উদ্যোগের দাবি
নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ মোঃ আনোয়ার হোসেন
ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট মৌসুমের স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বৃষ্টিপাত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এডিস মশার প্রজনন পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক, কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা), জনউদ্যোগ, পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চ, শিশুদের মুক্তবায়ু সেবন সংস্থা এবং পরিবেশ বার্তার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক মানববন্ধনে বক্তারা এ দাবি জানান। “ডেঙ্গু প্রতিরোধে ও প্রতিকারে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে” শীর্ষক এ কর্মসূচিতে পরিবেশবাদী, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন (পরিজা)-এর সভাপতি প্রকৌশলী আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে এবং জনউদ্যোগের সদস্য রাসেল ইসলাম সুজনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন পরিজার সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল, পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি আমির হাসান মাসুদ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তারিক চৌধুরী সোহেল, জনউদ্যোগের সদস্য সচিব তারিক হোসেন মিঠুল, শিশুদের মুক্তবায়ু সেবন সংস্থার মোহাম্মদ সেলিম, পরিবেশ বার্তার শম্ভু মিত্র, মাকসুদুল কবির সোহেল ও সুপর্ণা আকাশ নীলাসহ অনেকে। অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র পাঠ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত উপপরিচালক সাইফুল্লা তালুকদার।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় রক্তের উপাদান সংগ্রহ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে। শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আয়োজক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে মানববন্ধনে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
১. বছরব্যাপী মশক নিধন কর্মসূচি: বর্ষা মৌসুমের অপেক্ষায় না থেকে সারা বছর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কর্মসূচি চালু রাখতে হবে।
২. স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা: মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাজেট বরাদ্দ, ব্যয় ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
৩. সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য চিকিৎসা: ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত রক্তের উপাদান সরবরাহ এবং এনএস-১ (NS1) পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।
৪. পরিকল্পিত বর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা: ড্রেন, নালা ও জলাবদ্ধ স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ এবং এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের নয়; নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরীক্ষা করে অপসারণ করতে হবে। বিশেষ করে প্রতি সপ্তাহে এসব স্থান পরিষ্কার করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
মানববন্ধন থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর নজরদারি, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং বছরব্যাপী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিশ্চিত করে একটি নিরাপদ ও ডেঙ্গুমুক্ত নগর গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।