কুড়িগ্রামে তিন জমজ বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ
মেধা, অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার অনন্য দৃষ্টান্ত
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
একই পরিবারের তিন জমজ বোনের একসঙ্গে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জনের বিরল সাফল্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে কুড়িগ্রামে। মেধা, কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত অধ্যয়ন এবং পারিবারিক অনুপ্রেরণার সমন্বয়ে এই অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে তাবিয়া রহমান, তাহিয়া রহমান ও তাকিয়া রহমান।
তিন জমজ বোন কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালতের আইনজীবী তারিকুর রহমান তারিক ও গৃহিণী শাহিনা আক্তারের কন্যা। একই পরিবারের তিন সন্তানের একযোগে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভের খবর প্রকাশের পর আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী এবং শুভানুধ্যায়ীদের অভিনন্দনে ভাসছে পরিবারটি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় তাহিয়া রহমান ও তাকিয়া রহমান কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবং তাবিয়া রহমান অর্জুনডারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অংশ নেয়। তিনজনই কৃতিত্বের সঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করে নিজেদের অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছে।
শিক্ষকদের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই তিন বোনই অত্যন্ত মনোযোগী, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং শেখার প্রতি আগ্রহী। নিয়মিত পাঠাভ্যাস, সময়ানুবর্তিতা, শিক্ষকদের পরামর্শ অনুসরণ এবং পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতাই তাদের এই সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। তারা শুধু পরীক্ষার ফলেই নয়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অংশগ্রহণ করে নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের চেষ্টা করে।
বর্তমানে তাহিয়া রহমান ও তাকিয়া রহমান কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং তাবিয়া রহমান কুড়িগ্রাম বর্ডার গার্ড স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে।
তিন কন্যার এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত বাবা আইনজীবী তারিকুর রহমান তারিক বলেন, “এটি মহান আল্লাহর অশেষ রহমত। আমার মেয়েরা যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারে, সেই দোয়া চাই। শুধু ভালো ফল নয়, তারা যেন আদর্শবান, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।”
তিন কন্যার মা শাহিনা আক্তার জানান, তাদের তিন কন্যা মেধা, অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলায় সমান। তারা এই বয়সে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বুঝে উঠেছে। কখন পড়তে হবে, কখন খেলতে হবে আর কখন খেতে হবে এটা তারা নিয়ম নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছে। আগামিতে এই তিন কন্যা ধারাবাহিকভাবে তাদের সফলতা ধরে রাখতে পারবে। ‘আমাদের তিন কন্যা আমাদের তিনটি উজ্জ্ল প্রদীপ। কন্যাদের নিয়ে আমরা গর্বিত,’ তিনি বলেন।
কন্যাকুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, “একই পরিবারের তিন জমজ বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন নিঃসন্দেহে একটি বিরল ও গৌরবের ঘটনা। এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো কুড়িগ্রামের শিক্ষা অঙ্গনের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়। তাদের এই সাফল্য প্রমাণ করে, পরিকল্পিত অধ্যয়ন, পরিবারের সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে শিক্ষার্থীরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারে।”
তার মতে, প্রাথমিক স্তরে অর্জিত এমন সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি শিশুদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে এটি অভিভাবকদের জন্যও একটি বার্তা—সন্তানের প্রতি নিয়মিত সময় দেওয়া, পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করলে তারা আরও ভালো ফল করতে সক্ষম হয়।
তিন জমজ বোনের এই ব্যতিক্রমী অর্জন ইতোমধ্যে কুড়িগ্রামজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এটিকে জেলার শিক্ষাক্ষেত্রে একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তাদের এই সাফল্য নিঃসন্দেহে অন্য শিক্ষার্থীদেরও স্বপ্ন দেখতে, অধ্যবসায়ী হতে এবং নিজের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে অনুপ্রাণিত করবে।