আগেকার শিক্ষক ও বর্তমান শিক্ষক, আগেকার ছাত্র ও বর্তমান ছাত্র
সময় বদলেছে, বদলেছে শিক্ষা—বদলেছে কি মূল্যবোধ?৷ মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক বাংলার সংবাদ সিনিয়র স্টাফ রিপোটার,,,
একসময় শিক্ষক ছিলেন সমাজের অন্যতম শ্রদ্ধেয় মানুষ। তাঁদের হাতে থাকত বই, চোখে থাকত স্বপ্ন, আর মনে থাকত শিক্ষার্থীদের মানুষ করে তোলার অঙ্গীকার। সীমিত বেতন, সাধারণ জীবনযাপন আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করতেন। শিক্ষার্থীর ভুল শুধরে দেওয়া, অভাবের খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসব ছিল অনেক শিক্ষকের স্বাভাবিক দায়িত্ববোধের অংশ।
আগেকার ছাত্রদের জীবনও ছিল সংগ্রামময়। বই-খাতা জোগাড় করা, দূর থেকে হেঁটে স্কুলে আসা কিংবা সংসারের অভাব সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া—সবই ছিল তাদের বাস্তবতা। তবু অনেক শিক্ষার্থী অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা ও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষকের উপদেশ ছিল তাদের কাছে পথ চলার দিশা।
আজ সময় বদলেছে। শিক্ষার উপকরণ বেড়েছে, প্রযুক্তি হাতের নাগালে এসেছে, বেড়েছে শেখার সুযোগ। বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, সৃজনশীল ও তথ্যসমৃদ্ধ। একইভাবে, বহু শিক্ষক আধুনিক পদ্ধতিতে আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন।
তবে পরিবর্তনের এই সময়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।
কিছু শিক্ষকের কাছে শিক্ষকতা কি কেবল চাকরির দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে? কিছু শিক্ষার্থীর কাছে কি শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল আর সনদ অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠছে? কোথাও কি আন্তরিকতার জায়গা নিচ্ছে আনুষ্ঠানিকতা, আর শ্রদ্ধার জায়গা নিচ্ছে অবহেলা?
অবশ্যই সবাই এক রকম নন। অতীতের সব শিক্ষক আদর্শ ছিলেন না, বর্তমানের সব শিক্ষকও দায়িত্বহীন নন। তেমনি আগেকার সব ছাত্র অনুকরণীয় ছিল না, বর্তমান প্রজন্মও মূল্যবোধহীন নয়। দুই যুগেই ভালো-মন্দের সহাবস্থান রয়েছে।
আসল পার্থক্য শুধু সময়ের নয়, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের।
আগেকার শিক্ষকদের নিষ্ঠা ও অভিজ্ঞতা, বর্তমান শিক্ষার প্রযুক্তিগত সুবিধা, অতীতের শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায় এবং বর্তমান প্রজন্মের সৃজনশীলতা—সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে পারলেই শিক্ষা হবে সত্যিকার অর্থে জীবনমুখী।
কারণ, শিক্ষকের সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং কতজন সৎ, বিবেকবান ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর শিক্ষার্থীর প্রকৃত পরিচয় শুধু তার সনদে নয়, তার আচরণ, সততা ও দায়িত্ববোধে।
শিক্ষক যদি মানুষ গড়ার দায়িত্ব ভুলে যান, আর শিক্ষার্থী যদি শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে, তবে শিক্ষা থাকবে—কিন্তু তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হারিয়ে যাবে।
যুগ বদলাক, প্রযুক্তি এগিয়ে যাক, শিক্ষাপদ্ধতি আধুনিক হোক—তবু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে থাকুক।
শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা।
এটাই হোক আগামীর শিক্ষাব্যবস্থার অঙ্গীকার।