করমশ্রী গ্রামের অধ্যাপক ড. এম. তাজুল ইসলাম:
একটি সিদ্ধান্ত, বদলে গেল জীবন, দারিদ্র্যকে জয় করে হয়েছেন আলোকবর্তিকা,,
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক বাংলার সংবাদ সিনিয়র স্টাফ রিপোটার
যে ছেলেটি অভাবের তাড়নায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন, শিক্ষকদের দূরদর্শিতা ও সহযোগিতায় সেই ছেলেই একদিন হয়ে উঠেছিলেন একজন খ্যাতিমান কৃষিবিদ, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
জীবনের মোড় কখন, কীভাবে ঘুরে যায়, তা কেউ জানে না। কখনো একটি সুযোগ, কখনো একজন মানুষের বিশ্বাস, আবার কখনো একজন শিক্ষকের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে একটি মানুষের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ। অধ্যাপক ড. এম. তাজুল ইসলামের জীবন সেই সত্যেরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তাজুল ইসলামের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। বাবা ছিলেন না, মা থাকতেন অন্যের সংসারে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত তিনি মামাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তাজুল। কিন্তু ভালো ফলাফল করেও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারেননি তিনি। উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য ছিল না। জীবনধারণের জন্য দ্রুত একটি চাকরি প্রয়োজন—এমন বাস্তবতা তাঁকে তাড়া করছিল।
একদিন তিনি তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ব্রজেন্দ্র স্যারের কাছে গিয়ে বললেন,“স্যার, আমার অবস্থাটা তো জানেন। বাবা নেই, মা অন্যের সংসারে। লেখাপড়ার খরচ আপনারা দিয়েছেন। এখন হেড স্যারকে বলে আমাকে একটা প্রাইমারি শিক্ষকের চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। স্যারের তো অনেক বন্ধুবান্ধব আছেন।”
কথাগুলো ছিল একজন অসহায় অথচ আত্মমর্যাদাবান তরুণের বাস্তব জীবনের আবেদন। তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি। কিন্তু তাঁর শিক্ষকরা তাঁর ভবিষ্যৎকে দেখেছিলেন আরও বড় পরিসরে।
ব্রজেন্দ্র স্যার তাজুলকে নিয়ে গেলেন প্রধান শিক্ষক শামছুল হক স্যারের কাছে। তাঁর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরির ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও রাখলেন।
প্রধান শিক্ষক তাজুলকে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে বললেন। এরপর ব্রজেন্দ্র স্যারকে অন্য শিক্ষকদের ডেকে আনতে বললেন। সবাই মিলে আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তা ছিল অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয়।
তাঁরা বললেন, এই মেধাবী ছেলেকে এখনই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিতে আটকে দিয়ে তাঁর সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে চান না। বরং তাঁকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে।
শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে টাকা সংগ্রহ করলেন। সেই অর্থ তাজুলের হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে নিয়ে গেলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে।
সেখানে তাঁদের পরিচিত ছিলেন বড়কাশিয়ার আব্দুল হান্নান খান, যিনি হলদু মিঞা নামে পরিচিত ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ব্রজেন্দ্র স্যার তাঁকে তাজুলের কথা জানিয়ে বললেন, ছেলেটি ম্যাট্রিকে প্রথম বিভাগ পেয়েছে, অথচ অভাবের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরি চাইতে এসেছে। তার জন্য কিছু করা যায় কি না, দেখো।
হান্নান সাহেব শামছুল হক স্যারের বন্ধু ছিলেন। তিনি নিজে তাজুল ইসলামকে নিয়ে গিয়েলেন।এমন হেড মাস্টার এখন বিরল।
আব্দুল হান্নান খান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বললেন, তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাও। তিনি তাজুলের জন্য দুটি বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন।
সেদিন শিক্ষকেরা শুধু কিছু টাকা তুলে দেননি; তাঁরা একজন মেধাবী তরুণের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ। একটি চাকরি হয়তো তাঁকে তাৎক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি দিত, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তাঁকে পৌঁছে দিল জ্ঞানের বিস্তৃত জগতে। তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে গেল। শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়।
কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে তাজুল ইসলাম নিজেকে গড়ে তোলেন একজন দক্ষ কৃষিবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবে। তিনি কৃষিবিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি সফলভাবে সম্পন্ন করেন ২০টি পেশাগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
যুক্তরাজ্যে প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ (TOT), প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং বায়োমেট্রির মতো বিষয়ে তাঁর প্রশিক্ষণ তাঁকে বহুমাত্রিক দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করার কাজে নিয়োজিত থাকেন।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (GTI) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।
তাঁর দায়িত্বকালে—জিটিআইয়ের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়।
২৩টি কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হয়।
শিক্ষণ-সহায়ক উপকরণ ও প্রশিক্ষণসামগ্রী দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সমৃদ্ধ করা হয়।
১০টি আন্তর্জাতিক এবং ২০০টিরও বেশি জাতীয় প্রশিক্ষণ কোর্সের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করা হয়।
আটটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, ১৮টি প্রশিক্ষণ মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং পাঁচটি কর্মশালার কার্যবিবরণী প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হয়।
এগুলো ছিল পরিকল্পনা, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে তাঁর নিষ্ঠার পরিচয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিটিআইয়ের পরিচিতি বৃদ্ধি
পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রথম দুই বছরে বিদেশি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি জিটিআইয়ের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন। এ সময়ে ৩৫ জন বিশিষ্ট বিদেশি প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন রয়্যাল নেপাল দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত, ব্রিটিশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি, রয়্যাল নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ফার্স্ট ও সেকেন্ড সেক্রেটারি এবং চীনে নিযুক্ত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) প্রতিনিধি।
এ ছাড়া FAO, UNDP, ODA, DSO ও USA-সহ আটটি সংস্থার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
তাঁর দায়িত্বকালে দুই বছরে জিটিআই ৯ লাখ ২০ হাজার টাকারও বেশি রাজস্ব আয় করে। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
একসময় যাঁর নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, পরবর্তী জীবনে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের একজন সফল সংগঠক। এই রূপান্তর শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সুযোগ পেলে মানুষের কত দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, তারও প্রমাণ।
যাঁদের ভালোবাসায় গড়ে উঠেছিল তাঁর জীবন
তাজুল ইসলামের জীবনের সঙ্গে তাঁর মামাবাড়ির সম্পর্ক ছিল গভীর। পাবলিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক বারী স্যারের বাবা আব্দুল কাদির সাহেব ছিলেন তাজুলের মামা। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত মামাবাড়িতে থেকেই তিনি পড়াশোনা করেন।এই পারিবারিক আশ্রয়, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আন্তরিকতা তাঁর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তাজুল ইসলাম ছিলেন একজন নামকরা শিক্ষক—সৎ, ধার্মিক এবং ছাত্র-শিক্ষক সবার কাছে সমাদৃত। তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, বড় অর্জনের পেছনে ব্যক্তিগত মেধা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং সহযোগিতাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাত ১০টায় অধ্যাপক ড. এম. তাজুল ইসলাম ইহলোক ত্যাগ করেন। পরদিন ৫ আগস্ট জোহরের নামাজের পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান হয়েছে, কিন্তু তাঁর জীবনসংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প আজও অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে নতুন প্রজন্মকে।
তাঁর জীবনের দিকে তাকালে প্রথমেই মনে পড়ে সেই তরুণের কথা, যিনি অভাবের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। তারপর মনে পড়ে সেই শিক্ষকদের কথা, যাঁরা তাঁর মেধাকে চিনেছিলেন, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছিলেন এবং উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন।
ব্রজেন্দ্র স্যার, প্রধান শিক্ষক শামছুল হক স্যার, অন্য শিক্ষকেরা এবং আব্দুল হান্নান খান—তাঁদের সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া তাজুল ইসলামের জীবনের এই পথচলা হয়তো অন্য রকম হতে পারত।
একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ দেখতে পান, যখন সেই শিক্ষার্থী নিজেও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারে না।
তাজুল ইসলামের জীবনে তাঁর শিক্ষকেরা সেই কাজটিই করেছিলেন। আর তাজুল ইসলাম নিজের অধ্যবসায়, সততা ও কর্মনিষ্ঠা দিয়ে তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছিলেন।
আজ তাঁর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা—কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীকে শুধু তার আর্থিক অসচ্ছলতা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। সামান্য সহযোগিতা, একটি বৃত্তি কিংবা সঠিক সময়ে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত একজন শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে। আর সেই শিক্ষার্থী একদিন সমাজ, দেশ ও অসংখ্য মানুষের কল্যাণে অবদান রাখতে পারেন।
তাজুল ইসলামের গল্প তাই শুধু দারিদ্র্য জয় করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকদের বিশ্বাস, ত্যাগ ও মানবিকতার জয়গাথা।
শ্রদ্ধা অধ্যাপক ড. এম. তাজুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি।
গভীর কৃতজ্ঞতা সেই সব শিক্ষকের প্রতি, যাঁরা নিজেরা আলো হয়ে অন্যের জীবন আলোকিত করেন।
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা থেকে যায় বহু প্রজন্মের জন্য।