হাওর কেন্দ্রিক স্বতন্ত্র রাজনীতি “হাওরের রাজনীতি” গড়ে তুলতে হবে!
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক সিনিয়র স্টাফ রিপোটার দৈনিক বাংলার সংবাদ,,
হাওর বেষ্টিত জেলা মূলত সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
এই জেলাগুলোর মানুষ বিশেষ করে কৃষি এবং মাছ শিকারের উপর নির্ভরশীল!
এই হাওর অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র উপায় “হাওরের রাজনীতি”
মূলত হাওরে রাজনীতিটা হলো কৃষক এবং জেলে কেন্দ্রিক রাজনীতি।
উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলে কৃষকরা সু-সংগঠিত, ওই অঞ্চল গুলোতে কৃষকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলেই কৃষকরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
উত্তরাঞ্চলের নদী কেন্দ্রিক এলাকায় এবং দক্ষিণাঞ্চলের বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় মৎস্যজীবী তথা জেলেরা সু-সংগঠিত তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
তবে হাওর অঞ্চলের কৃষক এবং জেলেরা সু-সংগঠিত নয়, তাই তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলেও কখনো প্রতিবাদ করতে পারেনা, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনা।
তবে হাওর অঞ্চলের কৃষক এবং জেলেরা সংঘটিত হতে পারে না শুধুমাত্র সঠিক নেতৃত্বের অভাবে।
হাওর অঞ্চলের কৃষক এবং জেলেদের অধিকার আদায়ের কথা আসলেই মনে পড়ে সুনামগঞ্জের “ভাসান পানি আন্দোলন” এর কথা। ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। হাওরের মৎস্যজীবীরা ভাসান পানিতে মাছ ধরার দাবিতে ইজারাদার ও প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন প্রথাগত মাছ ধরার এই আন্দোলনে। আন্দোলনেরো বিপুল সাড়া মিলে, শুধু মৎস্যজীবীরাই নয় এ অঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক, সহ দরিদ্র ভূমিহীন লোকজনও আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। এ জন্য জেল জুলুম খেটেছেন অনেকে নেতাকর্মী। কিন্তু ক্রুশিয়াল মুভমেন্টে যেতে না যেতেই অধিকার প্রতিষ্ঠার আগেই আন্দোলনটি ঝিমিয়ে পড়ে। নেতৃত্ব শূন্যতা ও নেতৃত্ব বিচ্যুতির কারণে একটি সম্ভাবনাময় আন্দোলনের মৃত্যু ঘটেছে। এই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা তখন আবির্ভূত হয় নব্য ইজারাদার রূপে।
তারপর মাথায় আসে হাওরে অপরিকল্পিত কৃষিয়ান এবং পিআইসি প্রকল্পের অপরিকল্পিত “বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ” এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা। কৃষকরা এগুলো নিয়ে আন্দোলন করলেও নেতৃত্বের অভাবে সফল হতে পারছেনা।
তাই হাওরপাড়ে কৃষক, জেলে, শ্রমিক মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আপোষহীন নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।
না হয় যে ভাবে পূর্ববঙ্গের কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুরদের কষ্টে উপার্জিত টাকায় এলিটদের পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতা হয়ে উঠছিল অভিজাত, সে ভাবে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ হয়ে উঠবে অভিজাত আর অবহেলিত থাকবে হাওর বেষ্টিত জেলাগুলো।
হাওর অঞ্চলের মানুষের মুক্তির জন্য, হাওরের রাজনীতি গড়ে তোলার জন্য, আপোষহীন নেতৃত্ব তৈরির জন্য কৃষক, জেলে শ্রমিকদের সাথে মিশতে হবে।
হাওরপাড়ের কৃষক, জেলে, শ্রমিকদের অধিকার সচেতন এবং রাজনৈতিক সচেতন করে তুলতে হবে।
হাওরপাড়ের কৃষক, জেলে ও শ্রমিকদের অধিকার সচেতন ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে হলে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তথ্য, সংগঠন, স্থানীয় সমস্যা ও নাগরিক অধিকারকে।
বিশেষ করে হাওর এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় গ্রামভিত্তিক “অধিকার পাঠশালা” নামক ছোট ছোট উঠান বৈঠক করাতে হবে গ্রামে গ্রামে।
সেখানে সহজ ভাষায় আলোচনা করতে হবে কৃষকের জন্যে ন্যায্য দাম ও সরকারি ধান ক্রয়, সার, বীজ ও সেচের অধিকার নিয়ে, জেলেদের জন্যে জলমহাল ও মাছ ধরার অধিকার নিয়ে, শ্রমিকের জন্যে মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে। সরকারি ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও জাতীয় সংসদের দায়িত্ব নিয়ে। ভোটাধিকার ও জনপ্রতিনিধিকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
হাওর অঞ্চলের সমস্যার তালিকা করতে হবে, প্রতিটি গ্রামের মানুষের কাছ থেকে সমস্যা সংগ্রহ করে অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা তৈরি করতে হবে। যেমন ফসল রক্ষা বাঁধ, ফসলের ন্যায্যমূল্য, সার-বীজের সংকট, খাল/নদী খনন, জলমহাল, মাছের অভয়াশ্রম, রাস্তা ও যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, এবং কর্মসংস্থান নিয়ে কি কি সমস্যা। এরপর প্রতিটি সমস্যার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাজেট ও সমাধানের পথ তাদেরকে বুঝাতে হবে।
প্রতিটি গ্রামে গ্রামে স্বেচ্ছাসেবী কৃষক কমিটি, জেলে কমিটি ও শ্রমিক কমিটি গড়ে তুলতে হবে। এই কমিটিগুলো স্বতন্ত্র হলে এবং হাওর পাড়ের মেহনতি মানুষের সমস্যা নথিবদ্ধ ও তুলে ধরার প্ল্যাটফর্ম হলে মানুষ আশ্বস্ত হবে এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে।
প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কৃষক, জেলে ও শ্রমিকদের নিয়ে “জনশুনানি” এর আয়োজন করতে হবে। এই জনশুনানিতে মানুষ লিখিতভাবে অভিযোগ দেবে, সমস্যাগুলো লিপিবদ্ধ হবে, তারপর সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠানো হবে, এবং পরবর্তী সভায় অগ্রগতি জানানো হবে। এতে মানুষ শুধু অভিযোগকারী নয়, জবাবদিহি দাবি করতে শিখে যাবে। যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হাওরপাড়ের কৃষক জেলে শ্রমিকদের সন্তানদের স্বেচ্ছাসেবী নেতৃত্ব হিসেবে তৈরি করতে হবে, এই তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক এবং সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। তারা হাওর অঞ্চলের মানুষদের সকল ধরনের সহযোগিতা করবে।
রাজনৈতিক সচেতনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মানুষকে বোঝানো ভোট শুধু একটি দিনের বিষয় নয়, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাজের হিসাব নেওয়াও নাগরিকের দায়িত্ব। নির্বাচনের আগে প্রার্থী পরিচিতি ও প্রতিশ্রুতি যেমন থাকবে, নির্বাচনের পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের হিসাব প্রকাশের দাবি থাকতে হবে।
হাওরভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একটি ছোট ডাটাবেজ থাকবে, এই কাজটা করবে এই অঞ্চলের তরুণরা।
তারা কৃষক সংখ্যা, জেলে পরিবার, শ্রমজীবী পরিবার, আবাদি জমি, বাঁধের সংখ্যা ও অবস্থা, রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জলমহাল, প্রধান সমস্যা, সরকারি প্রকল্প, প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন অবস্থা নিয়ে সকল তথ্য সংগ্রহ করবে। তথ্য হাতে থাকলে রাজনৈতিক সচেতনতা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ উদ্যোগকে যদি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রচারণা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে কৃষক, জেলে, শ্রমিকের বড় অংশ দূরে সরে যেতে পারে। বরং এই কার্যক্রমের মূল বার্তা হতে হবে “দল যার যার, অধিকার সবার।”
এভাবে কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদে একটি সচেতন, প্রশ্ন করতে জানে এমন এবং নিজের এলাকার উন্নয়ন ও অধিকার নিয়ে সংগঠিত হাওরবাসী গড়ে তোলা সম্ভব।
এভাবেই গড়ে তুলতে হবে “হাওরের রাজনীতি”।