তিস্তাপাড়ের মানুষের কষ্ট
’তিস্তার পানি বাড়লেও হামার বিপদ, কমলেও হামার বিপদ।
লালমনিরহাটর জেলা পতিনিধি
রওশন বাবু
০১৭২৫১৯২৪২৪
তিস্তা নদীর পানি বাড়লে দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি, আর পানি কমে গেলে দেখা দেয় ভাঙন পরিস্থিতি। বন্যা আর ভাঙনের কষাঘাতে চরম কষ্টে বসবাস করছেন রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ের মানুষ। লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী বিপুল সংখ্যক পরিবারের কষ্টের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিনচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকি (৭০) জানান, বুধবার সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত তিস্তা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তাদের বাড়ী-ঘরে নদীর পানি ঢুকে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তাদের গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় বুধবার বিকেলে তারা গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছেন। জমিতে লাগানো রোপা আমন ধানের চারা পানিতে তলিয়ে গেছে। ৪-৫ দিনের মধ্যে খেত থেকে নদীর পানি নেমে না গেলে ধান গাছের ক্ষতি হবে।
’হামরাগুলা তিস্তাপাড়োত কষ্ট করি বাঁচি আছি। হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ আর নাই। তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার কষ্ট আর পানি নামি গ্যাইলেও হামারগুলার কষ্ট। পানি বাড়লে বান হয় আর পানি নামি গ্যালি নদীভাঙন শুরু হয়। হামারগুলার খালি বিপদ আর বিপদ,’ তিনি বলেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামের কৃষক আজগর আলী (৬০) জানান, বুধবার রাতে তার বাড়িতে হাঁটু পানি ছিলো। তারা বাড়ী-ঘর ছেড়ে নিরাপদে চলে এসেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমছে। আবারো তিস্তায় পানি বাড়তে পারে। গেল দেড় মাসধরে তিস্তা নদীর পানি ওঠানামা করছে। পানি একটু বাড়লেই তিস্তাপাড়ে বন্যা দেখা দেয় আর পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে দেখা দেয় ভাঙন। গেল একমাসে তাদের গ্রামে প্রায় ১০০টি বসনতভিটা নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন,’ হামার বাড়ীটাও নদীর কাচারোত পড়ি গ্যাইছে। এইবার ভাঙন শুরু হইলে বাস্তুভিটাটা আর বাঁচা যাবার নয়। ১০ শতক বাস্তুভিটার জমিকোনায় মোর শ্যাষ সম্বল।’
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকার কৃষক আনছার আলী মন্ডল (৬৫) বলেন, বুধবার সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত নদীর পানিতে তাদের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে ঘরের ভেতর নদীর পানি। গ্রামের সবগুলো রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। ‘তিস্তাত অল্প এ্যাকনা পানি বাড়লে হামারগুলার বাড়ী-ঘরোত পানি ঢুকি যায়। পানি বাড়লে হামার এত্যি বান হয় আর পানি কমি গ্যাইলে ভাঙন হয়। বান আর ভাঙনোত পড়ি হামরাগুলা প্রতনিয়িত জমি হারবার নাইকছি। হামারগুলার কপালোত সুখ আর নাই,’ তিনি বলেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর এলাকার কৃষক জাহিদ হোসেন (৫০) বলেন, বুধবার সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত যেভাবে তিস্তা নদীর পানিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাতে তারা ভয়ে বাড়ী-ঘর ছেড়ে নিরাপদে চলে এসেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমছে তবে তারা এখনো নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন। পানি আরেকটু কমলে তারা বাড়ীতে যাবেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১০ মিটার যা বিপদ সীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে (বিপৎসীমা ৫২.১৫ মিটার)। সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে আরো ২ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পায়। রংপুরের কাউনিয়া ও গাইবান্ধার তারাপুর পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে গতকাল বুধবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, বুধবার তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হলেও বৃহস্পতিবার সকালে পানি কমে বিপৎসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি কমা অব্যাহত রয়েছে। উজানে ভারক থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি না আসলে তিস্তার পানি বাড়বে না। ‘এভাবেই গেল দেড় মাসধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। তিস্তাপাড়ে সাধারনত ফ্লাশ ফ্লাড হয়ে থাকে। বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টার মধ্যে পানি নেমে যায়,’ তিনি বলেন।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বাড়ছে। এসব নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। শুক্রবারের মধ্যে দুধকুমার ও ধরলার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ‘উজানে ভারতের আসামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ কারনে ভাটিতে ব্রহ্মপুত্র নদপাড়ে বন্যা পরিস্থিতির আশংকা রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে,’ তিনি বলেন।