রবীন্দ্রপ্রবাহ ও বাঙালি জাতিসত্তা: আমাদের জাতীয় জীবনে চিরকালীন রবীন্দ্রনাথ
—– মানিক লাল ঘোষ ——
বাঙালি জাতির মনন, ইতিহাস, সংগ্রাম এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। বর্ষার স্নিগ্ধতা থেকে শুরু করে জাতীয় আত্মমর্যাদার উচ্চতম শিখর—সর্বত্রই তাঁর উপস্থিতি সরব ও পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে জাতীয় সংগীত নির্বাচন থেকে শুরু করে তাঁর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীর মেলবন্ধন—সব মিলিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং আমাদের দৈনন্দিন জাতীয় জীবনে রবীন্দ্রনাথ এক আলোকবর্তিকা।
আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার ও অনুভূতির জায়গা হলো আমাদের জাতীয় সংগীত—’আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বাঙালিকে এক সূত্রে বাঁধতে রবীন্দ্রনাথ এই গানটি রচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, তখন এই গানটিই হয়ে ওঠে আমাদের জাতীয় মুক্তি ও বিজয়ের সুর। একটি জাতির জাতীয় সংগীতে তার মাটি, মানুষ, নদী ও প্রকৃতির এমন গভীর প্রেম আর কোথাও বিরল। এই একটি গানই আমাদের আত্মপরিচয় ও জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।
১২ টিরও বেশি ঋতুচক্র এবং শতবর্ষ পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথের জন্ম আমাদের সংস্কৃতিতে চিরনবীন। ২৫ বৈশাখ—এই দিনটিতে বাঙালির ঘরে ঘরে যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, তা কেবল একজন কবির জন্মজয়ন্তী নয়; এটি বাঙালির মননচর্চার নবায়ন। শান্তিনিকেতনের ছায়াঘেরা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে বাংলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে তাঁর গান, কবিতা ও নাটক উচ্চারিত হয়। তাঁর জন্ম যেন আবহমান বাংলার কৃষ্টি ও আধুনিক চেتনার এক অপূর্ব সংযোগ ঘটিয়েছিল।
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যিক সাধনার স্বীকৃতি ছিল না, এটি ছিল এশিয়ার প্রথম কোনো লেখকের নোবেল জয় এবং বিশ্বমঞ্চে বাঙালি সংস্কৃতির মুকুটে প্রথম বড় রত্ন যুক্ত হওয়া। পশ্চিমা আধিপত্যের যুগে প্রাচ্যের এক কবির লেখনী যে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে সমানভাবে সমাদৃত হতে পারে, তা গোটা জাতিকে এক নতুন আত্মমর্যাদা ও উচ্চতা দিয়েছিল। এই অর্জন আমাদের শিখিয়েছে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরতে।
শ্রাবণের বারিধারার মতো বাঙালির হৃদয়কে আর্দ্র করে আসে ২২ শ্রাবণ। ১৯৪১ সালের এই দিনে কবিগুরু নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতিতে তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি শোকের দিন নয়, বরং এটি তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পুনর্মিলনের উপলক্ষ। বর্ষার রিমঝিম শব্দের সঙ্গে মিশে থাকা ২২ শ্রাবণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রূপ ও রসের যে সাধনা রবীন্দ্রনাথ করে গেছেন, তা মৃত্যুঞ্জয়ী। শোককে শক্তিতে এবং সুন্দরে রূপান্তর করার যে শিক্ষা বাঙালি সংস্কৃতি পায়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই বর্ষার দিনটি।
আজকের আধুনিক বাংলাদেশে আমাদের চিন্তা, চেতনা, প্রতিবাদ এবং প্রেম—সবকিছুর সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ মিশে আছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রবীন্দ্রসংগীত ও তাঁর বাণী আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যখন বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসের অপচেষ্টা চালিয়েছিল, তখন রবীন্দ্রচর্চাই হয়ে উঠেছিল আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল অতীতের কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ-বেদনায়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকটে এবং উৎসবের আনন্দে এক নিরন্তর সঙ্গী। বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, তার জাতীয় জীবনে, মননে ও সংস্কৃতির বিকাশে রবীন্দ্রপ্রবাহ একইভাবে বহমান।
( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)