বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৬ অপরাহ্ন

রংপুরে বাবা-দাদার পর প্রাণ হারাল শিশু বন্ধন এক দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেল একটি পরিবারের তিন প্রজন্ম আরমান হোসেন রাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্ট। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২

Update : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

রংপুরে বাবা-দাদার পর প্রাণ হারাল শিশু বন্ধন
এক দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেল একটি পরিবারের তিন প্রজন্ম

আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্ট।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা ও দাদাকে হারানোর মাত্র ১১ ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যুর কাছে হার মানল সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু বন্ধন চন্দ্র রায়। গুরুতর আহত অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিল সে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শুক্রবার রাত ১টার দিকে নিভে যায় ছোট্ট বন্ধনের জীবনপ্রদীপ।

এর মধ্য দিয়ে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল একই পরিবারের তিন প্রজন্ম। বাবা, দাদা এবং নাতির এমন করুণ মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। গ্রামের বাতাসজুড়ে এখন শুধু আহাজারি আর কান্নার শব্দ।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়বিল ইউনিয়নের মন্থনা বাজারসংলগ্ন জুট মিল এলাকার সড়কে একটি ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বন্ধনের বাবা প্রশান্ত চন্দ্র রায় (৩৫)। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটির দাদা নির্মল চন্দ্র রায়কে (৭৫) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয় শিশু বন্ধনকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও আর বাঁচানো গেল না।

নিহত নির্মল চন্দ্র রায় ও তার ছেলে প্রশান্ত চন্দ্র রায় গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের পশ্চিম মানদ্রাইন গ্রামের বাসিন্দা। প্রশান্ত চন্দ্র রায় পেশায় একজন পল্লীচিকিৎসক ছিলেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সেবাপরায়ণ ও মানবিক একজন মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে গোসল সেরে নতুন পোশাক পরে বাবার সঙ্গে মোটরসাইকেলের সামনে বসেছিল ছোট্ট বন্ধন। পেছনে বসেছিলেন তার দাদা নির্মল চন্দ্র রায়। পরিবারের তিনজনের গন্তব্য ছিল তুলসীহাটের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। আনন্দঘন সেই যাত্রাই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় আজীবনের শোকে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গঙ্গাচড়া থেকে বড়াইবাড়ীর দিকে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন তারা। মন্থনা বাজারসংলগ্ন জুট মিলের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাককে সাইড দেওয়ার চেষ্টা করেন মোটরসাইকেলচালক প্রশান্ত চন্দ্র রায়। এ সময় সড়কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ধানের খড়ের কারণে মোটরসাইকেলটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি পিছলে ট্রাকের সামনে চলে যায়। মুহূর্তেই ট্রাকের সামনের চাকায় পিষ্ট হন বাবা, দাদা ও নাতি। দুমড়ে-মুচড়ে যায় মোটরসাইকেলটি। ঘটনাস্থলেই মারা যান প্রশান্ত।
স্থানীয় লোকজন দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকি]সক নির্মলকে মৃত ঘোষনা করেন। চিকিৎসাধিন অবস্থায় সবশেষে প্রাণ হারায় ছোট্ট বন্ধন।

গ্রামবাসীরা জানান, যে বাড়িতে বৃহস্পতিবার দুপুর পযর্ন্ত শিশু বন্ধনের হাসির শব্দে মুখর থাকত উঠান, সেখানে এখন শুধুই স্বজন হারানোর বিলাপ। একই চিতায় কিংবা একই দিনে বাবা, ছেলে ও নাতির শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে হবে—এমন নির্মম বাস্তবতা কেউ কল্পনাও করেননি। পুরো পশ্চিম মানদ্রাইন গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

স্থানীয় বাসিন্দা জয়হরি চন্দ্র রায় বলেন, “নির্মল চন্দ্র রায় ও তার ছেলে প্রশান্ত চন্দ্র রায় দুজনই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। প্রশান্ত গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক সময় বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসাসেবা দিতেন। আর বন্ধন ছিল সবার আদরের ফুটফুটে শিশু। একই দুর্ঘটনায় পরিবারের তিন প্রজন্মকে হারিয়ে পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। নিহতদের স্বজনরা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। শ্মশানে একসঙ্গে তিনজনের শেষকৃত্যের প্রস্তুতি চলছে।”

গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান দুলু বলেন, “নির্মল চন্দ্র রায় ও তার ছেলে প্রশান্ত চন্দ্র রায় এলাকায় অত্যন্ত পরিচিত ও সেবাপরায়ণ মানুষ ছিলেন। একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের সবাইকে শোকাহত করেছে। পরিবারটির সদস্যদের কান্না থামছে না। প্রশান্তের স্ত্রী বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। এমন দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।”

গঙ্গাচড়া মডেল থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) আব্দুস ছবুর বলেন, “দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। তবে ট্রাকচালক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত মামলা হয়েছে। চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”


More News Of This Category