ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে বছরে ২৬৫১৪ মিলিয়ন ইউনিট উৎপাদনের সম্ভাবনা
১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয় সভায়
আরমান হোসেন রাজু
বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বছরে প্রায় ২৬ হাজার ৫১৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে দাবি করেছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বছরে গড়ে ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যেতে পারে বলেও তারা জানিয়েছেন।
রংপুর নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত ‘হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতায় বাংলাদেশে জ্বালানি ঝুঁকি তীব্র: রংপুরে সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এসব তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন পরিবেশ ও উন্নয়নমূলক বেসরকারি সংস্থা ডেভেলপমেন্ট অব পুওর সোসাইটি (ডপস)-এর নির্বাহী পরিচালক উজ্জ্বল চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার পরিবার রয়েছে এবং আবাসিক খাতে জাতীয় গ্রিডের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয়।
তিনি জানান, দেশের মোট পরিবারের অন্তত ৪১ শতাংশ যদি নিজ নিজ বাড়ির ছাদে কমপক্ষে এক কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১৬ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াটে উন্নীত হতে পারে। এই সক্ষমতা থেকে বছরে ২৬ হাজার ৫১৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
উজ্জ্বল চক্রবর্তী আরও বলেন, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ যদি ফার্নেস অয়েল বা অপরিশোধিত খনিজ তেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন করা হয়, তাহলে শুধু জ্বালানি ব্যয় বাবদই প্রায় ৪৮ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বিপরীতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি আমদানির চাপ কমাবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি হলেও সাধারণ মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে।
তিনি বলেন, ছাদে সৌর প্যানেলের ব্যাপক ব্যবহার সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দিতে পারে। এতে তাদের হাতে একটি স্থিতিশীল ও স্বনির্ভর বিদ্যুতের উৎস তৈরি হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের নিজস্ব ভবন, অফিস, হাসপাতাল ও অন্যান্য স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এফইডি) রংপুরের সভাপতি এস এম পিয়াল।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের আগস্টে ঘোষিত ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের কর্মসূচি যথাযথ বাস্তবায়ন করা গেলে এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানির জ্বলন্ত চুল্লি থেকে মুক্তি ও জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমাতে সরকারকে নিজস্ব ভবনগুলো ব্যবহারে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রংপুর ইউনিটের সভাপতি এস এম পিয়াল।
এস এম পিয়াল জানান, দেশের ১ লাখ ২২ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ হাজার ১৩৭টি কলেজ ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে, জ্বালানি আমদানি হ্রাস পাবে এবং সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্প খাতে ব্যবহার করা যাবে।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে উৎপাদন ব্যাহত হবে না, ফলে রপ্তানি আয়ও বাড়তে পারে।
কৃষিখাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে। বিপরীতে বিদ্যুতচালিত সেচপাম্পের সংখ্যা ৫ লাখ ১০ হাজার এবং সৌরচালিত সেচপাম্প মাত্র ৩ হাজার ৬০২টি।
এসব ডিজেলচালিত পাম্প পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে সরকার বছরে প্রায় ১০ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা বা ৮৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ডিজেল আমদানি কমাতে পারবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ফি-ভিত্তিক সৌরসেচ ব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির সাশ্রয়েও কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফোরামের সাধারন সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও সৌরসেচ ছাড়াও কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, খালের ওপর সৌরপ্যানেল স্থাপন এবং নদীপাড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প জ্বালানি আমদানি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, দেশজুড়ে ৩২ হাজার ৩১৫টি জলাশয়ে অন্তত ১১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া দেশের প্রায় ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার পুকুর এলাকার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করেই ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব।
তার ভাষায়, জমির স্বল্পতা মোকাবিলায় এসব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ভবিষ্যতের টেকসই জ্বালানি সমাধান হতে পারে।
এর আগে একই স্থানে সকালে ‘জ্বালানির জ্বলন্ত চুল্লি থেকে মুক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
সুপারিশগুলো হলো—জ্বালানি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গঠন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ঋণচক্র থেকে বেরিয়ে আসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আর্থিক প্রণোদনা, জাতীয় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি গ্রহণ, সৌরপার্ক দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন, সৌরসেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দক্ষ জনবল তৈরি, স্বল্পসুদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল গঠন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, পরিচালনায় দক্ষতা ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই জ্বালানির জন্য ভর্তুকি সংস্কার।