আরমান হোসেন রাজু
গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রংপুর বিভাগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ছয় স্তরের কঠোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন। বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনের
৪৫৪৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫৬১টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৮২৭টি।
ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি থাকবে গোয়েন্দা নজরদারি, বডিওর্ন ক্যামেরা, সিসিটিভি, মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর কমান্ডো গ্রুপ। চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা, অতীতে সংঘর্ষপ্রবণ ও প্রভাবশালী প্রার্থীর বাড়ির আশপাশের কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর পুলিশ লাইন্সে নির্বাচনী ব্রিফিং প্যারেড শেষে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইন সাংবাদিকদের জানান, রংপুর জেলায় মোট ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২১টি এবং আট উপজেলায় ৯৫টি কেন্দ্র রয়েছে।
এসপি মারুফাত হুসাইন বলেন, “নির্বাচন শান্তিপূর্ণ রাখতে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব-সেক্টর ও সেক্টরভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।”
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের সদস্যদের শরীরে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা, যার লাইভ মনিটরিং করা হবে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে।
তিনি আরও বলেন, “পুলিশের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এখন পর্যন্ত জেলার নির্বাচনী পরিবেশ ভালো রয়েছে। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) জানিয়েছে, জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের তিনটির আংশিক এলাকায় তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব থাকবে। এসব এলাকার ২০৪টি কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩০টি মোবাইল পেট্রোল টিম ও ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স মোতায়েন থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়েছে আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা।
রংপু জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন, পুরুষ ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩১ জন।
জেলায় ৮৭৩টি কেন্দ্রে মোট ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ। নির্বাচনের দিন রংপুর বিভাগের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় কোনো কেন্দ্র ঘিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ড্রপের মাধ্যমে কমান্ডো মোতায়েন করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রংপুর বিভাগের চার জেলা—রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় তিন হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম শফিকুর রহমান জানান, এসব জেলায় ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করছে। তারা চেকপোস্ট স্থাপন, টহল, মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “ভোটকেন্দ্রগুলোর ঝুঁকি বিবেচনায় তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডগ স্কোয়াড মোতায়েন, গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।” ‘বিভাগের চার জেলায় মোট ২ হাজার ৫৭২টি কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৬০০টি কেন্দ্র বিজিবির বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে,’ তিনি বলেন।
পুলিশের রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের আট জেলার ৩৩টি সংসদীয় আসনে রয়েছে ৩০টি পৌরসভা ও ৫৩৩টি ইউনিয়ন। মোট ভোটকেন্দ্র চার হাজার ৫৪৬টি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৬১টি এবং অতিঝুঁকিপূর্ণ ৮২৭টি কেন্দ্র।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা হবে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে।” ‘পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যা ব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীও সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা জোরদারে মাঠে রয়েছে,’ তিনি বলেন।