শেরে বাংলা ও বঙ্গবন্ধু: একটি জাতির মুক্তি ও স্বপ্নের অবিনাশী যোগসূত্র
————– মানিক লাল ঘোষ ——————-
বাঙালির রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—এই দুই নাম যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজনের পূর্ণতা কল্পনা করা অসম্ভব। শেরে বাংলা যেখানে বাঙালির অধিকার আদায়ের জমি তৈরি করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেখানে রোপণ করেছিলেন স্বাধীনতার বীজ এবং তাকে ফলবন্ত মহীরুহে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁদের এই সম্পর্কটি কেবল রাজনৈতিক সহকর্মী বা নেতায়-কর্মীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল এক প্রজ্ঞাবান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, যা বাংলার পলিমাটি ও মানুষের হৃদস্পন্দনের সাথে মিশে আছে।
১৯৩৮ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির কথা ভাবলে আজও রোমাঞ্চ জাগে, যখন গোপালগঞ্জের এক কিশোর শেখ মুজিব নির্ভীকচিত্তে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলার পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। দাবি ছিল সামান্য—স্কুলের জরাজীর্ণ ছাদ সংস্কার—কিন্তু সেই দাবির পেছনে যে সাহস ছিল, তা শেরে বাংলাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি সেদিন হয়তো এই কিশোরের চোখের মনিতে আগামীর স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। রাজনীতির ময়দানে তাঁদের সম্পর্ক ছিল ‘নানা ও নাতি’র মতো এক সুমধুর আবহে ঘেরা। শেরে বাংলা কৌতুক করে বলতেন, “আমি বুড়া, তুই গুঁড়া।” কিন্তু এই ‘গুঁড়া’ বা কনিষ্ঠ নেতার ওপর যে তাঁর অগাধ আস্থা ছিল, তা প্রমাণিত হয় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল শেরে বাংলার অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী চেতনার ওপর। ১৯৪০ সালে শেরে বাংলার উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই নিহিত ছিল বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের প্রথম স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন যে, শেরে বাংলা যে একাধিক রাষ্ট্রের ইঙ্গিত দিয়ে লাহোর প্রস্তাব করেছিলেন, তা-ই ছিল বাঙালির মুক্তির আসল সনদ। পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফার মূল সুরটিও ছিল সেই লাহোর প্রস্তাবের আধুনিক ও চূড়ান্ত সংস্করণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে অত্যন্ত আবেগের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, শেরে বাংলা ছিলেন বাংলার মাটির প্রকৃত সন্তান। সাধারণ মানুষের মনে হক সাহেবের আসন ছিল এতই গভীরে যে, রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কটূক্তি সহ্য করত না। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নিজের পিতা ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা তাকে হক সাহেবের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে নিষেধ করতেন। এটিই ছিল সেই সময়ের রাজনীতির এক অনন্য সৌজন্যবোধ।
২৭শে এপ্রিল। বাঙালির ইতিহাসের সেই শোকাতুর দিন, যখন ১৯৬২ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। শেরে বাংলার এই প্রয়াণ দিবসে আমরা অত্যন্ত বিনম্রচিত্তে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে তিনি যেভাবে বাংলার অবহেলিত কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াই শুরু করেছিলেন, তা ছিল অকল্পনীয়। ঋণের জালে জর্জরিত বাঙালি কৃষককে রক্ষা করতে তাঁর ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠন আজও এক কালজয়ী পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। শেরে বাংলা যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, তাঁর লড়াই এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল মূলত একই চেতনার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। শেরে বাংলা চেয়েছিলেন শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, আর বঙ্গবন্ধু তাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে উপহার দিয়েছেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। শেরে বাংলার মৃত্যুকালে বঙ্গবন্ধু কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি সংগ্রামে শক্তি জুগিয়েছিল। আজ এই বিশেষ দিনে বাংলার এই দুই মহানায়কের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। শেরে বাংলা যেখানে শেষ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন—আর তাঁদের এই সম্মিলিত স্বপ্নই আজকের আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
( মানিক লাল ঘোষ :- সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)