১০ সন্তান থেকেও আশ্রয়ের অনিশ্চয়তায় ৮০ বছরের জয়নব, দুই মাসের ব্যবস্থা করলেন ইউএনও মনিরা খাতুন
‘মরহুম স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না’—ছেলের ঘরে আপাতত আশ্রয়, স্থায়ী আবাসনের অপেক্ষায় বৃদ্ধা
মোঃ রুহুল আমিন, বিশেষ প্রতিনিধি, শাহরাস্তি (চাঁদপুর) থেকে : ছয় ছেলে ও চার মেয়ের মা জয়নব বানু। বয়স ৮০ বছর। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বার্ধক্যে এসে তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া একটু নিরাপদ আশ্রয়। অথচ ১০ সন্তান থাকা সত্ত্বেও সেই আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর। নিজের স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় একটি ছোট ঘরে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে চান তিনি। কিন্তু সেই চাওয়াও এখনো পূরণ হয়নি।
‘আমি আমার মরহুম স্বামীর ভিটা ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। ছেলেরা আমার স্বামীর রেখে যাওয়া জমিতে একটি দুচালা ঘর করে দিলে সেখানেই থাকব।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের এই আকাঙ্ক্ষার কথা জানান জয়নব বানু।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের কাদরা পূর্বপাড়ার সৈয়দ আহম্মেদর বাড়ির বাসিন্দা জয়নব বানু। তাঁর স্বামী সৈয়দ আহম্মেদ ১৯৯৮ সালে মারা যান। এরপর ছয় সন্তানকে বড় করা এবং সংসারের দায়িত্ব সামলানোর মধ্য দিয়ে কেটেছে তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু বার্ধক্যে এসে নিজের থাকার জায়গা নিয়ে তাঁকে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার বাড়িতে ফিরে জয়নব বানু সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ছেলে মনির হোসেনের ঘরের দরজায় বসে ছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর থাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় একপর্যায়ে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে থাকেন। এ সময় পথচারী এক ব্যক্তি তাঁর কাছে পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। পরে তিনি জয়নব বানুকে একই গ্রামের মেয়ে ঝরণা খাতুনের বাড়িতে পৌঁছে দেন। সেখানে চার দিন অবস্থান করেন বৃদ্ধা।
এদিকে বিষয়টি জানার পর বৃদ্ধার পাশে দাঁড়ান শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে তিনি ঝরণা খাতুনের বাড়ি থেকে জয়নব বানুকে নিয়ে তাঁর ছেলে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে যান। আনোয়ার সৌদি আরবপ্রবাসী। তাঁর স্ত্রী হাজেরা বেগমের তত্ত্বাবধানে আপাতত দুই মাসের জন্য বৃদ্ধার থাকার ব্যবস্থা করেন ইউএনও মনিরা খাতুন।
তবে এই সাময়িক ব্যবস্থায় স্বস্তির পাশাপাশি নতুন দুশ্চিন্তাও রয়েছে জয়নব বানুর মনে। দুই মাস পর তিনি কোথায় যাবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো তাঁর জানা নেই। তাঁর চাওয়া, স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হোক, যাতে জীবনের শেষ দিনগুলো নিজের পরিচিত পরিবেশে কাটাতে পারেন।
জয়নব বানুর ছয় ছেলের মধ্যে বড় ছেলে শাহাজাহান শারীরিক প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় ছেলে আবুল কাসেম দেশে ট্রাক চালান। তৃতীয় ছেলে আনোয়ার হোসেন, চতুর্থ ছেলে আনিছুর রহমান, পঞ্চম ছেলে মনির হোসেন ও ষষ্ঠ ছেলে ঈমাম হোসেন সৌদি আরবপ্রবাসী বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন বলে জানা যায়। চার মেয়ের মধ্যে পেয়ারা খাতুন মনোহরগঞ্জে স্বামীর বাড়িতে থাকেন। অন্য মেয়েদের মধ্যে ঝরণা খাতুনসহ কয়েকজন একই এলাকার বাসিন্দা।
জয়নব বানুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি। তাঁর ছোট ছেলে ঈমাম হোসেনের বয়স যখন গর্ভে সাত মাস, তখনই মারা যান তাঁর স্বামী সৈয়দ আহম্মেদ। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের লালন-পালন করে বড় করেছেন তিনি। সেই সন্তানদের পরিবার ও জীবন গড়ে ওঠার পরও আজ নিজের আশ্রয় নিয়ে তাঁকে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে—এমন বাস্তবতা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে।
তবে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কেন বৃদ্ধার স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি, স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তাঁর বসবাসের অধিকার ও বাস্তব পরিস্থিতি কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে পারিবারিক বিরোধ বা কারও দায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বৃদ্ধ বয়সে নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জয়নব বানুর ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে আপাতত দুই মাসের আশ্রয় মিললেও তাঁর দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সমস্যার সমাধান এখনো বাকি। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর যথাযথ সমাধান এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
একজন মায়ের কাছে শেষ বয়সের চাওয়া হয়তো খুব বেশি কিছু নয়—একটু নিরাপদ আশ্রয়, পরিচিত ভিটায় থাকার সুযোগ আর সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। জয়নব বানুর আকুতি তাই কেবল একজন বৃদ্ধার ব্যক্তিগত দুর্দশার গল্প নয়; এটি পরিবারে প্রবীণদের নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার প্রশ্নও সামনে আনে।
দুই মাসের সাময়িক আশ্রয়ের পর জয়নব বানুর কী হবে—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তাঁর অসহায় জীবনের বাস্তবতা।