_(সুন্নাহ-হাদীসের পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি; সুন্নাহ-হাদীসকে কেন্দ্রীয় জীবনব্যবস্থার উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা এবং সুন্নাহ-হাদীস সম্পর্কে সকল ভ্রান্তি দূর করা):_
_সারসংক্ষেপ:_ সুন্নাহ ইসলামী জীবনব্যবস্থার মূলনীতিগত ভিত্তি। তবে সমসাময়িক মুসলিম সমাজে এটি প্রায়শই ফরজ–ওয়াজিবের নিচে তৃতীয় স্তরের ‘ঐচ্ছিক’ আমল হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদর্শিক নেতৃত্ব কার্যত সংকুচিত হয়ে গেছে। এই পর্বে আলোচিত হয়েছে, হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণের ইতিহাসে প্রবেশের আগে সুন্নাহকে কেন্দ্রীয় জীবনব্যবস্থার উপাদান হিসেবে বোঝা কতটা জরুরি, এবং কিভাবে ভুল ধারণা ইতিহাসের পাঠে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
*১. ভূমিকা: ইতিহাসে প্রবেশের আগে কেন প্রস্তুতি অপরিহার্য:* প্রিয় পাঠক, হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণের ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন বা নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়; এটি সরাসরি ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো (Epistemic Framework) ও জীবনব্যবস্থাগত কর্তৃত্ব (Normative Authority)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই এই ইতিহাসে প্রবেশের আগে একটি বৌদ্ধিক প্রস্তুতি অপরিহার্য।
এর পূর্ববর্তী ৪৪টি পর্বে আমরা “সুন্নাহ–হাদীসের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও মর্যাদা” নিয়ে যে বিস্তৃত আলোচনা করেছি, তার উদ্দেশ্য ছিল তথ্য জোগাড় নয়; বরং একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ। কারণ ইতিহাস কখনো নিজে নিজে কথা বলে না; পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিই ঠিক করে দেয় ইতিহাস কীভাবে বোঝা হবে।
যদি সুন্নাহকে কেবল “ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাহ ও নফল” এই ফিকহি শ্রেণিবিন্যাসের তৃতীয় স্তরের একটি ‘ঐচ্ছিক ইবাদত’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে হাদীস সংকলনের ইতিহাস পাঠকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই গৌণ ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হবে। তখন প্রশ্ন আসবে—“এত কষ্ট করে হাদীস যাচাই, সংকলন ও সংরক্ষণের দরকারই বা কী ছিল?”
কিন্তু যদি সুন্নাহকে কুরআনের বাস্তব প্রয়োগ, নববী জীবনব্যবস্থার রূপায়ণ এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণযোগ্য আদর্শ কাঠামো হিসেবে বোঝা হয়, তাহলে হাদীস সংকলনের ইতিহাস আর সাধারণ ইতিহাস থাকে না; তা হয়ে ওঠে ইসলাম কীভাবে বাস্তবে সংরক্ষিত হলো, তার একটি দায়িত্বশীল জ্ঞানচর্চার দলিল।
এই কারণেই এই পর্বটি সরাসরি ইতিহাসে প্রবেশ না করে একটি পূর্বপ্রস্তুতিমূলক (Foundational) আলোচনা হিসেবে সাজানো হয়েছে। এখানে আমরা ইতিহাসের ঘটনা নয়, বরং ইতিহাসে প্রবেশের মানসিক ও বৌদ্ধিক শর্তগুলো স্পষ্ট করব।
অর্থাৎ, (ক). আমরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই ইতিহাস পড়ছি, (খ). কী কী প্রচলিত ভুল ধারণা আমাদের সঙ্গে অজান্তেই যুক্ত হয়ে আছে, এবং (গ). এই সিরিজ শেষ হলে পাঠক কী ধরনের প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাবে।
এই প্রস্তুতি ছাড়া হাদীস সংকলনের ইতিহাস হয়তো পড়া যাবে, কিন্তু বোঝা যাবে না। আর এই সিরিজের লক্ষ্য কেবল পাঠ নয়; লক্ষ্য হলো বোঝাপড়া, আত্মবিশ্বাস এবং জ্ঞানগত ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, ইন-শা-আল্লাহ।
*২. কেন “হাদীস সংকলনের ইতিহাস” জানা অপরিহার্য?:* অনেকে প্রশ্ন করেন: “কুরআন থাকলেই তো হয়, হাদীস সংকলনের ইতিহাস জানার দরকার কী?” উত্তর: এটি ইতিহাসবিমুখতার প্রশ্ন নয়; বরং সুন্নাহ সম্পর্কে অসম্পূর্ণ বোঝাপড়া। কারণ: হাদীস হলো সুন্নাহ সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম; সুন্নাহ হলো কুরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ। হাদীস সংকলনের ইতিহাস জানা মানে: ইসলাম কীভাবে বাস্তবে সংরক্ষিত হলো, নববী জীবন কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছেছে, এবং মুসলিম উম্মাহ কীভাবে জ্ঞানগত জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে তা বোঝা
*৩. একটি মৌলিক ভুল ধারণা: ‘হাদীস মানে শুধু বাণী’:* হাদীস কেবল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বলা কথার সংগ্রহ নয়। বরং নবুওয়াত ও রিসালাতের পদমর্যাদায় এবং কর্তৃত্বে পরিচালিত “কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম”-এর অধীনে কুরআনের ব্যাখ্যা (সূরা নাহল, ১৬:৪৪) যা নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কথায়, বক্তব্যে, কাজে, জীবনাচরণে আইনগত মর্যাদায় প্রকাশ পেয়েছে, সেই কুরআন শিক্ষা কার্যক্রমের সকল বিষয়বস্তু এবং তার পূর্ণবিবরণ ‘সুন্নাতে-রাসূল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত; যা আল্লাহর অনুমতিক্রমে জিবরীল (আ.)-এর নিকট থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত (৫৩:৫); যিনি নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ক্বলবে কুরআন নাযিল করেন (২:৯৭; ২৬:১৯২-১৯৩)।
সমাজে কুরআন প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যার আওতায় নবীজীর সকল বক্তব্য, কাজ, নীরব সম্মতি, জীবনাচরণ এবং জীবনব্যবস্থাগত সিদ্ধান্ত ‘সুন্নাতে-রাসূল’ এবং কুরআনের পরেই তা ইসলামী শারি’য়াতের অন্যতম মূল ভিত্তি। অতএব, হাদীস সংকলনের ইতিহাস মানে কেবল উক্তি- বাণী সংরক্ষণ নয়, বরং নবীজি (ﷺ) পরিচালিত ‘কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম’-এর পূর্ণ বিবরণ এবং মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী জীবনপদ্ধতি সংরক্ষণের ইতিহাস।
*৪. ইতিহাস পাঠের আগে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নসমূহ:* পাঠকের মনে যে সব মৌলিক প্রশ্ন উদ্রেক হয়, যা সিরিজে আলোচনা করা হবে:
(ক). রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে হাদীস কি লেখা হতো?
(খ). যদি লেখা হতো, তাহলে কেন পরে সংকলন শুরু হলো?
(গ). ‘হাদীস লেখা নিষেধ ছিল’, এই দাবির সত্যতা কী?
(ঘ). সাহাবীরা কি যাচাই না করেই হাদীস বর্ণনা করতেন?
(ঙ). সনদ ব্যবস্থা কি পরে তৈরি করা হয়েছে?
(চ). সহিহ–যঈফ বিভাজন কি ব্যক্তিগত মত?
এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া হবে না; বরং দলিল ও যুক্তির আলোকে পর্বভিত্তিকভাবে আলোচনা করা হবে, ইন-শা-আল্লাহ।
*৫. সিরিজের পদ্ধতি (Methodology):* এই সিরিজে আমরা তিনটি নীতির উপর চলব, ইন-শা-আল্লাহ:
_(ক). ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা:_ প্রাথমিক উৎস, সাহাবী-তাবেঈ চর্চা, ও স্বীকৃত গ্রন্থের আলোকে আলোচনা।
_(খ). উসূলি বিশ্লেষণ:_ কেন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করা হলো, তার দর্শন ও প্রজ্ঞা ব্যাখ্যা।
_(গ). আধুনিক সংশয়:_ কুরানিজম (Qurʾān-only) দাবি ও জনপ্রিয় বিভ্রান্তির পর্যালোচনা।
*৬. এই পর্বের সীমা ও উদ্দেশ্য:* সরাসরি কোনো যুগভিত্তিক ইতিহাসে ঢোকা হয়নি; এবং কোনো নাম বা সাল আলোচিত হয়নি। মূল উদ্দেশ্য: হাদীস সংকলনের ইতিহাস বোঝার জন্য সুন্নাহকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে কেন্দ্রীভূত করা, যেন সুন্নাহ গ্রহণের পর ইতিহাসে আর কোন “বিতর্কিত গল্প” না থাকে; বরং তা হয়ে ওঠে দায়িত্বশীল জ্ঞানসংরক্ষণ প্রক্রিয়া।
*৭. উপসংহার:* এই ২য় পর্বটি ছিল দরজার মতো: ইতিহাসের ঘরে প্রবেশের আগে দরজায় দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করা। পরবর্তী পর্ব–৩: সুন্নাহ কী? কুরআনিক, নববী ও উসূলি সংজ্ঞা (সংক্ষিপ্ত পুনঃস্থাপন) সংজ্ঞাভিত্তিক আলোচনা (বিস্তারিত আলোচনার জন্য পর্ব:১–৪৪-এর রেফারেন্স)। দো’আ: আল্লাহ আমাদের সত্য বোঝার ও তা অনুসরণের তাওফিক দিন।
*আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন*। (মূসা: ১৫-০১-২৬)