সেচ নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে বোনারপাড়া জোনাল অফিস; ‘৯০ শতাংশ সেচপাম্পই স্থানান্তরিত’—ডিজিএম
স্টাফ রিপোর্টার:
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় বাংলাদেশ সেচ নীতিমালা লঙ্ঘন করে অনুমোদিত স্থান পরিবর্তন করে অগভীর নলকূপ স্থাপন এবং পরে সেসব নলকূপে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত দাগ ও খতিয়ানভুক্ত স্থান থেকে শত শত ফুট, কোথাও এক থেকে দুই হাজার ফুট দূরে নলকূপ স্থানান্তর করা হলেও নির্বিঘ্নে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোনারপাড়া জোনাল অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সেচ মালিক ও কৃষকদের অভিযোগ, অনেকেই অনুমোদিত স্থান পরিবর্তন করে অন্যের জমিতে কিংবা অন্য বৈধ সেচ প্রকল্পের নির্ধারিত সেচ এলাকার মধ্যেই নতুন করে নলকূপ স্থাপন করেছেন। পরে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব নলকূপে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে বৈধ সেচ লাইসেন্সধারীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে বোনারপাড়া জোনাল অফিসে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ জুমারবাড়ী ইউনিয়নের আব্দুল্ল্যারপাড়া গ্রামের বৈধ সেচ লাইসেন্সধারী মো. সাইফুল ইসলাম গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ১৬৩২ নম্বর সেচ লাইসেন্সের আওতায় অনুমোদিত স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রকৃত তথ্য গোপন করে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। এতে তার বৈধ সেচ এলাকার মধ্যেই নতুন সেচ প্রকল্প গড়ে ওঠায় তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার সঞ্জীব কুমার রায় বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য বোনারপাড়া জোনাল অফিসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একই অফিসকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বোনারপাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) জালাল উদ্দীন অনিয়মের ব্যাপকতার কথা স্বীকার করে বলেন, “এত অনিয়ম আমি অন্য কোথাও দেখিনি। এখানে প্রায় ৯০ শতাংশ সেচপাম্পই অনুমোদিত স্থান পরিবর্তন করেছে। এ বিষয়ে একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। অবৈধভাবে স্থানান্তর করা সেচপাম্পগুলোকে নির্ধারিত স্থানে ফিরিয়ে নিতে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু একা হয়ে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আব্দুল্ল্যারপাড়া গ্রামের মোত্তালেবের সেচপাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও নির্দেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমি এখন নিরুপায়।” তবে কেন তার নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়নি কিংবা কারা বাধা দিয়েছেন—সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
এদিকে স্থানীয় একাধিক সেচ মালিক অভিযোগ করেন, বোনারপাড়া জোনাল অফিসের লাইন ইনস্পেক্টর সামছুল হক এবং প্রকৌশলী রায়হান আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থানান্তরিত সেচপাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে লাইন ইনস্পেক্টর সামছুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। প্রকৌশলী রায়হানের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
ডিজিএমের বক্তব্যে যখন প্রায় ৯০ শতাংশ সেচপাম্প স্থানান্তরের তথ্য উঠে এসেছে, তখন প্রশ্ন উঠেছে—এত বিপুল সংখ্যক সেচপাম্প কীভাবে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে পরিচালিত হলো? তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা তখন কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? স্থানীয় কৃষক ও বৈধ সেচ লাইসেন্সধারীদের দাবি, পুরো বিষয়টি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) অথবা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।