নাজমুল হাসান
রমজানের রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন হঠাৎ ঢাকের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসে, তখন মনে হয় ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। পুরনো কায়রোর ফাতেমি পথঘাট, সরু অলিগলি আর প্রাচীন প্রাসাদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আমি বহুবার দেখেছি সেই দৃশ্য মেসহারাতির নির্ভীক পদচারণা, হাতে ছোট ঢাক, কণ্ঠে সেহরির ডাক। এ এক এমন ঐতিহ্য, যা শুধু মানুষকে জাগায় না, জাগিয়ে তোলে শতাব্দী পেরিয়ে আসা এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
আমার বাসা যেহেতু ওল্ড কায়রোর ঐতিহাসিক অঞ্চলের কাছাকাছি, তাই এই দৃশ্য আমার কাছে নতুন নয়। তবু এ বছরের প্রথম রমজানের সেই রাতটি যেন বিশেষভাবে হৃদয়ে দাগ কেটে গেছে। তারাবির নামাজ শেষে আমরা কয়েকজন সহপাঠী মিলে গল্পে মেতে ছিলাম রমজানের প্রস্তুতি, ইতিহাস আর নানান আলাপে রাত গভীর হয়ে উঠছিল। হঠাৎই দূর থেকে ভেসে এলো পরিচিত সেই তাল ঢাকের মৃদু ধ্বনি। মুহূর্তেই স্মৃতির দরজা খুলে গেল। এক বছর পর আবার ফিরে এসেছে সেই চিরচেনা ডাক “ইয়া নায়েম, ওয়াহহিদুদ দায়েম…”
সেই কৌতূহল থেকেই আমি খুঁজতে শুরু করি—কোথা থেকে এলো এই ঐতিহ্য? কিভাবে শতাব্দী পেরিয়ে আজও বেঁচে আছে?
★ উৎপত্তির প্রাচীন রেখাচিত্র
ইতিহাসবিদদের মতে, সেহরির জন্য মানুষকে জাগানোর প্রথা ইসলামের প্রাচীন যুগেই শুরু হয়। বর্ণনায় পাওয়া যায়, সাহাবি আনবাসা ইবনুল আব্বাস (রা.)-কে অনেকেই প্রথম মুসাহহারাতি হিসেবে উল্লেখ করেন। যিনি উমর (রা.)-এর যুগে আসকার থেকে ফুসতাত (কায়রো) পর্যন্ত ঘুরে সেহরির ডাক দিতেন। তখনো ঢাকের জোরালো ব্যবহার শুরু হয়নি; ছিল কণ্ঠের আহ্বান আর মানবিক দায়িত্ববোধ।
★ ফাতেমী যুগে আনুষ্ঠানিক রূপ
মিশরে এই প্রথা প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ফাতেমী আমলে। খলিফা হাকেম বি আমরিল্লাহ (১০০৪ খ্রি.) সৈন্যদের নির্দেশ দেন রাতের বেলায় ঘরে ঘরে কড়া নেড়ে মানুষকে জাগাতে। এখান থেকেই মেসহারাতির সংগঠিত যাত্রা শুরু। পরে মোমবাতি হাতে, সুরেলা কণ্ঠে এবং ধীরে ধীরে ছোট ঢাক যোগ হয়ে ঐতিহ্যটি আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
★মামলুক আমলের সুর ও শৈলী
মামলুক যুগে এসে এই প্রথা পায় নান্দনিক পরিপূর্ণতা। “শায়খে মেসাহারাতি” নামে খ্যাত এক ব্যক্তিত্ব—ইবন নুকতাহ—সুলতান আল-নাসের মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মুসাহহির ছিলেন বলে উল্লেখ আছে। এ সময় ঢাক-তবলার তাল, নাশিদ ও ছন্দময় হাঁক একে শুধু ব্যবহারিক কাজ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করে।
★অটোমান থেকে আধুনিক নগর
অটোমান আমলে কায়রোর পাড়া-মহল্লায় মেসহারাতি হয়ে ওঠে রমজানের অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। তারা শুধু জাগাত না,মানুষের নাম ধরে ডাকত, দোয়া করত, আর এক ধরনের সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলত।
কিন্তু সময় থেমে থাকে না। ব্রিটিশ যুগ পেরিয়ে আধুনিক কালে মাইক্রোফোন, লাউডস্পিকার, এমনকি মোবাইল অ্যাপও সেহরির ঘোষণা দিতে শুরু করে। তবুও আশ্চর্যের বিষয় পুরনো কায়রোর অনেক গলিতে আজও সেই মানুষটি আছেন, গালাবিয়া পরে, হাতে ছোট ঢাক নিয়ে, শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে হাঁটছেন।
★পোশাক ও বাদ্যের প্রতীকী ভাষা
মেসহারাতির পরিচয় শুধু তার কণ্ঠে নয়, তার সাজেও। ঢিলেঢালা গালাবিয়া, মাথায় টাকিয়া বা পাগড়ি সব মিলিয়ে তিনি যেন চলমান লোকঐতিহ্য। হাতে ছোট ড্রাম বা তবলা-জাতীয় বাদ্য যার তালে রাতের নীরবতা কেঁপে ওঠে। এই সরল উপকরণই তাকে আলাদা করে দেয় আধুনিক প্রযুক্তির কৃত্রিম শব্দ থেকে।
★আয়ের মানবিক রীতি
সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো মেসহারাতির কাজ মূলত ভালোবাসার। পাড়া-মহল্লার মানুষ তাকে খেজুর, খাবার বা সামান্য অর্থ দিয়ে সম্মান জানায়। ধনী পরিবারগুলো কখনো বিশেষ উপহার দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি পেশার চেয়ে সেবাই বেশি একটি সামাজিক আমানত।
★ঐতিহ্যের স্থায়ী আবেদন
আজকের ডিজিটাল যুগে যখন অ্যালার্ম ঘড়ি বা মোবাইল সহজেই মানুষকে জাগাতে পারে, তখনও মেসহারাতির উপস্থিতি কেন এত প্রিয়? হয়তো কারণ, এটি শুধু জাগানোর শব্দ নয়—এটি স্মৃতি, সম্প্রদায়, আধ্যাত্মিকতা এবং রমজানের আবেগের সম্মিলিত প্রতিধ্বনি।
পুরনো কায়রোর সেই রাতগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্য কখনো কেবল অতীত নয়, তা বর্তমানের হৃদস্পন্দনেও বেঁচে থাকে।
রমজানের এই পবিত্র সময়ে সবার জন্য রইল আন্তরিক ভালোবাসা, দোয়া ও শুভেচ্ছা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সিয়াম ও কিয়াম কবুল করুন, আমাদের জীবন ভরে উঠুক রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের নূরে।
শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর