শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন
Headline :
মুসলিম উম্মাহর বিভাজনের মূল কারণসমূহ: অনলাইন টিভি / আইপি টিভি চালাতে যা করতে হয়* – বাংলাদেশে এটা বৈধভাবে করতে BTRC ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে। আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত কাউন্সিল। দিনাজপুরে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সাইক্লিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ডে-লাইট ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠিত। দিনাজপুর বীরগঞ্জ উপজেলায় পৃথক অভিযানে গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে পুলিশ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন লালমনিরহাট-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য গণমানুষের নেতা জনাব মোঃ রোকন উদ্দিন বাবুল মহোদয়। প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে মইনীয়া যুব ফোরামের মানববন্ধন:সকল স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান ।

মুসলিম উম্মাহর বিভাজনের মূল কারণসমূহ:

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

*মুসলিম উম্মাহর বিভাজনের মূল কারণসমূহ:*

_(ইতিহাস, জ্ঞানতত্ত্ব ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে একটি বিশ্লেষণ):_

*সারসংক্ষেপ:* মুসলিম উম্মাহ আজ রাজনৈতিক, মতাদর্শিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। আন্তর্জাতিক ইস্যু, যেমন ইরান–ইসরাইল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিয়ে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তুলতে ব্যর্থতা এই বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রবন্ধে ঐ বিভাজনের মূল কারণসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে: (১) ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভাঙন, (২) জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট, (৩) রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, (৪) মাযহাবিক ও মতাদর্শিক মেরুকরণ, (৫) শিয়া ও সুন্নী বিভাজন, (৬) ভূরাজনৈতিক নির্ভরতা, এবং (৭) নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

*১. খিলাফত-পরবর্তী রাজনৈতিক ভাঙন:* উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক ছিল ঐতিহাসিক খিলাফত ব্যবস্থা। ১৯২৪ সালে অটোম্যান খিলাফত পতনের পর মুসলিম বিশ্ব একক রাজনৈতিক নেতৃত্ব হারায়। এর ফলে, (ক). কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ভেঙে যায়; (খ). মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আলাদা আলাদা জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত হয়; এবং (গ). উম্মাহ ধারণা রাজনৈতিক বাস্তবতার বদলে আবেগীয় ধারণায় পরিণত হয়। এটি বিভাজনের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করে।

*২. উপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও কৃত্রিম সীমানা:* গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্স সহ ইউরোপীয় শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় কৃত্রিম সীমারেখা তৈরি করে। ফলে, (ক). একই সংস্কৃতি ও আকীদার মানুষ ভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়; (খ). রাষ্ট্রস্বার্থ উম্মাহস্বার্থের উপর প্রাধান্য পায়; (গ). সামরিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হয়। এই কাঠামো আজও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক আচরণকে প্রভাবিত করছে।

*৩. জাতীয়তাবাদ বনাম উম্মাহ চেতনা:* জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ নিজের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে, (ক). তুরস্ক তুরস্কের স্বার্থ দেখে; (খ). ইরান ইরানের কৌশলগত স্বার্থ দেখে; এবং (গ). সৌদি আরব তার আঞ্চলিক আধিপত্য রক্ষা করে। উম্মাহ একটি নৈতিক ধারণা; কিন্তু রাষ্ট্রনীতি বাস্তববাদী কাঠামো অনুসরণ করে। এই দ্বন্দ্ব ঐক্যের পথে বাধা।

*৪. মাযহাবিক ও মতাদর্শিক মেরুকরণ:* শিয়া–সুন্নি বিভাজন, মাযহাব ভিত্তিক বিভাজন, রাজনৈতিক ইসলাম বনাম রাজতান্ত্রিক ইসলাম, গণতান্ত্রিক ইসলাম বনাম বিপ্লবী ইসলাম, এসব মতাদর্শিক বিভাজন উম্মাহকে দ্বিমেরু বা বহুমেরুতে বিভক্ত করেছে।

উদাহরণস্বরূপ: (ক). ইরান নিজেকে প্রতিরোধ অক্ষের নেতৃত্ব মনে করে; (খ). সৌদি আরব ভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থানে; (গ). ইসরাইল প্রশ্নে মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ আবেগ প্রকাশ করলেও কৌশলগতভাবে বিভক্ত; (ঘ). আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অনেক মুসলিম দেশের নিরাপত্তা জোট রয়েছে; ফলে একই ইস্যুতে উম্মাহর ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

*৫. শিয়া–সুন্নি বিভাজন:* শিয়া ও সুন্নী মতপার্থক্য মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করেছে। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল নেতৃত্ব (ইমামত/খিলাফত) এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের ব্যাখ্যা নিয়ে উদ্ভূত একটি মতপার্থক্য, কিন্তু ইতিহাসের ধারায় এটি কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যার সীমায় না থেকে রাষ্ট্রনীতি, ভূরাজনীতি এবং আঞ্চলিক জোটবিন্যাসের সাথেও যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে ইরান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম-প্রধান রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান প্রায়ই এই ঐতিহাসিক বিভাজনের প্রভাব বহন করে, যা উম্মাহর একক অবস্থান গ্রহণকে জটিল করে তোলে। তবে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, এই মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস তাওহিদ, নবুওয়াত, কুরআন ও আখিরাত, এ ব্যাপক ঐক্য বিদ্যমান; তাই এই বিভাজনকে ধর্মীয় অপরিহার্য দ্বন্দ্ব হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা হিসেবে বোঝা অধিক যৌক্তিক।

*৬. জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট (Epistemic Crisis):* একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: আমরা কি আধুনিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বকে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের সাথে সংযুক্ত করতে পেরেছি? অনেক স্কলার আলেম ফিকহে পারদর্শী হলেও, (ক). আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি, (খ). ভূরাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power), (গ). রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক আইন, এবং (ঘ). সামরিক কৌশল, এসব বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে চান না। অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম এলিটদের একটি অংশ শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক কাঠামোতে মাথা ঘামাতের চান না। ফলে দ্বৈত জ্ঞানব্যবস্থা (dual epistemology) তৈরি হয়েছে।

*৭. প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের অভাব:* মুসলিম বিশ্বে এমন কোনো কার্যকর কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান নেই যা উম্মাহভিত্তিক ঐকমত্য তৈরি করতে পারে। যেমন: ইউরোপে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’; পশ্চিমা জোটে ‘ন্যাটো’। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে সমপর্যায়ের কার্যকর কাঠামো অনুপস্থিত; ‘ও,আই,সি এবং ওপেক’-এর কার্যকারিতা সীমিত।

*৮. অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও ভঙ্গুরতা:* বহু মুসলিম রাষ্ট্র ঋণনির্ভর, জ্বালানিনির্ভর, এবং অস্ত্র আমদানিনির্ভর। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব না থাকলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যায়। ফলে বিশ্ব সংঘাতে তারা ‘নীতিগত অবস্থান’ নয়, ‘কৌশলগত নিরাপত্তা’ বেছে নেয়।

*৯. আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া বনাম কৌশলগত বাস্তবতা:* উম্মাহর জনগণ প্রায়ই ‘আবেগভিত্তিক ঐক্য’ প্রকাশ করে; কিন্তু রাষ্ট্রনেতারা ‘বাস্তববাদী কূটনীতি’ অনুসরণ করেন। এই বিচ্ছিন্নতা ‘মাঠের অনুভূতি’ ও ‘রাষ্ট্রের নীতির’ মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।

*১০. ইরান–ইসরাইল–যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গ (বিভাজনের বাস্তব উদাহরণ):* কেউ ইরানকে প্রতিরোধ শক্তি মনে করে; কেউ ইরানকে সম্প্রসারণবাদী শক্তি ভাবে; কেউ ইসরাইলবিরোধী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছায়া ছাড়তে পারে না; এবং কেউ নিরপেক্ষ কৌশল বেছে নেয়। এটি ‘আদর্শগত’ নয়, বরং ‘ভূরাজনৈতিক’ বাস্তবতার প্রতিফলন। উম্মাহ কি ব্যর্থ: ‘ব্যর্থতা’ শব্দটি আবেগী হলেও বাস্তবতা হলো, উম্মাহ একটি নৈতিক-আধ্যাত্মিক ঐক্য; রাষ্ট্রসমূহ একটি কৌশলগত-রাজনৈতিক সত্তা। এই দুইয়ের মধ্যে কাঠামোগত সমন্বয় না থাকায় বিভাজন দেখা যায়।

*১১. সম্ভাব্য উত্তরণের পথ:* (ক). ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব ও আধুনিক সামাজিক বিজ্ঞানের সমন্বিত শিক্ষা; (খ). শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ/রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের যৌথ ফোরাম; (গ). অর্থনৈতিক সহযোগিতা ব্লক গঠন; (ঘ). আবেগ নয়, কৌশলগত বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত; এবং নৈতিক ঐক্য ও রাজনৈতিক বহুত্বের সহাবস্থান স্বীকার।

*১২. উপসংহার:* উম্মাহর বিভাজনের মূল কারণ শুধুমাত্র আলেমদের রক্ষণশীলতা নয়; বরং ঐতিহাসিক পতন, উপনিবেশিক কাঠামো, জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা, জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক ও সামরিক নির্ভরতা, এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তববাদ। এই সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যর্থতা স্বীকার করা সাহসের পরিচয়; কিন্তু বিশ্লেষণ ছাড়া আত্মসমালোচনা আত্মদণ্ডে পরিণত হয়। সুতরাং প্রশ্ন হওয়া উচিত, উম্মাহ কেন বিভক্ত? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ‘কীভাবে জ্ঞান, নৈতিকতা ও কৌশলের সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন সম্ভব’?

*আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন।* (মূসা: ১৭-০৪-২৬)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category